সেই ছেলেটা
5018
4
806
|   Feb 28, 2017
সেই ছেলেটা

ছেলেটা ভালো আঁকত। এমনিতে চুপচাপ, গম্ভীর টাইপ। পাড়ার লোকেরা বলত, বয়সের তুলনায় ভাবুক বেশী নাকি। আর পাঁচটা সমবয়সী বাচ্চাদের মতো ছটফটে না, দৌঁড়ে বেড়ানো টাইপ না। বেশ বড়োলোক ফ্যামিলিরও। বাবা মন্ত্রী, মা বিশাল খানদানি পরিবার থেকে। অঢেল পয়সা। পাঠিয়ে দেওয়া হল ছেলেকে বোর্ডিং স্কুলে। আগেই বলেছি, ইন্ট্রোভার্ট বাচ্চা। মানাতে অসুবিধা হচ্ছিল স্কুলের পরিবেশে। বারবার বলত মা বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। মা আবার ঠাকুর দেবতা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়া ঘরে আরও কয়েকটা ছেলেপুলে তাঁর। ফালতু কথায় কান না দিয়ে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিলেন অন্য আরেকটা স্কুলে। এখানেও মন বসলনা। ডিপ্রেসনের হাতেখড়ি হল। চাকরি পেতে বেগ পেতে হয়নি অবশ্য। পড়াশোনায় খারাপ ছিলনা। কুড়ি বছর বয়সেই নিজের বাবার থেকে বেশী পয়সা কামাতে শুরু করল। খুশী খুশী মন। একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে গ্যালো ধপ্ করে। মেয়েটা বাড়িওয়ালা কাকুর মেয়ে। তদ্দিনে অন্য একটা বেশ হোমড়াচোমড়া পয়সাওয়ালার সাথে তার বিয়ের কথা প্রায় পাকা। চ্যাংড়া ছেলেটাকে এখন পাত্তা দিলেনা চলবেনা।

আবার, মন ভেঙে গ্যালো ছেলেটার।

অন্য জায়গায় চাকরি নিল। আহামরি চাকরি না হলেও পয়সা আসছে মোটামুটি, কিন্তু কাজটা একদমই ভালো লাগছেনা। ঠাকুর দেবতা, পুজো আচ্চা নিয়ে সময় কাটাতে শুরু করল আস্তে আস্তে। একসময় ওটাই প্যাশন হয়ে দাঁড়াল। ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করবে ঠিক করল। লোকে বলে, যেটা প্যাশন সেটা pursue করলে নাকি ভালো ফল আসবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগে ভর্তির পরীক্ষা দিল খেটেখুটে। ফেল্ হয়ে গেল। ধর্মতত্ত্বর একটা sub-subject-এর ওপর পড়ার স্কোপ্ আছে জানতে পারল অন্য একটা জায়গায়। আবার পড়াশোনা, আবার অ্যাপ্লিকেশন্ ফর্ম, আবার এন্ট্রান্স্ পরীক্ষা। আর, আবার ফেল্। খেপে গ্যালো ছেলেটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনই কি সব ? তাঁর ভেতরে যে প্যাশন আছে জিনিসটা নিয়ে, তার দাম নেই ? কাউকে শেখাতে হবেনা। সে নিজেই শিখে নেবে ধর্মতত্ত্ব, ঈশ্বরে পৌঁছনোর রাস্তা। পুরোহিতের কাজ নিল। দেখল, একই ধর্মের নীচু জাতির মানুষের থাকা খাওয়ার জায়গা নেই। রাস্তায় পড়ে আছে। নিজের বাড়িটা ছেড়ে দিল, তাদের কয়েকজনের থাকার জন্যে। নিজে থাকতে শুরু করল ছোট্ট একটা ঘরে। খড়ের বিছানায় শোয়। চলবেনা। এসব করলে পুরুত সমাজের স্ট্যাটাস্ থাকেনা। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হল চাকরি থেকে। এবারও। নদীতে কিছু জল বয়ে গ্যাছে তারপর। বেকার ছেলে এখন বাবা মার বাড়িতেই থাকে। চারপাশের লোকজন, গাছগাছালি, আকাশ দেখে। যেটা মনে ধরে, ব্রাশ্ দিয়ে ছবিতে ফুটিয়ে তোলে। তুলতে তুলতে আবার একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় হুট করে। মেয়েটা বিধবা। ৮ বছরের বড় তাঁর থেকে। বাচ্চাও আছে। তবুও ওঁর তাকেই চাই। প্রেম অন্ধ। প্রেমিকা কিন্তু অন্ধ না। ওঁকে বিয়ে করবেনা বলে দিল সটান। কেন ? বেকার ছেলে তো।  ব্যর্থ প্রেম, আবার। মন ভাঙা। ভাঙা মন নিয়ে রঙ তুলি ধরে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে ভুলে থাকা। তাঁর cousin ততদিনে মোটামুটি নামী painter. দেখে খুব ইচ্ছে হয়, ওর মতো নামডাকওয়ালা পেন্টার হতে। ওর কাছে গিয়ে কাজ শিখতে শুরু করে। কিন্তু এসব আর্ট ফার্ট আবার হেব্বি পয়সার ব্যাপার মাইরি। দাদা বলেছে, পয়সা দিয়ে ভালো সুন্দর মডেল ভাড়া করে ছবি আঁকতে। পয়সা কই ? অতএব, রাস্তার ভিখিড়ি এনে মডেল করা। ছবি আঁকা। আর্ট ঠিকমতো হওয়া নিয়েই তো কথা। জানতে পেরে, দাদার বকা। ছাড়তে হল কাজটা। আবার। শরীর বিদ্রোহ করছিল কদিন ধরেই। ডাক্তার দেখাতে দেরী করতে করতে একটু বেশী দেরী হয়ে গ্যালো। প্রায় তিন সপ্তাহ হাসপাতালে শুয়ে অবশেষে বাড়ি ফেরৎ। এবার নিজের মতোই ছবি আঁকতে শুরু। পাত্তা পেলনা বিশেষ। কেউ কেনেনা ওঁর ছবি। মদ খাওয়া বাড়িয়ে দিল অনেকটা। একা একা থাকে। খাওয়া পরার কোন ঠিক নেই। মাঝখানে বন্ধুর সাথে ঝগড়া করে নিজেই নিজের বাঁ কানের অনেকটা ছিঁড়ে দিল ব্লেড্ দিয়ে। লোকে বলছে, ছেলেটা নাকি বদ্ধ পাগল এখন। আত্মহত্যা করল একদিন। বুকে গুলি করে। তখন ৩৭ বছর বয়স। এবার হঠাৎ শিল্পীমহলে চাপা ফিসফাস্ শুরু হল ছেলেটাকে নিয়ে। ফিসফাস্ থেকে আলোচনা, আলোচনা থেকে একটা exhibition. একটা থেকে কয়েকটা exhibition. কয়েকটা থেকে অনেকগুলো। সবকটা সাকসেসফুল। চড়া দাম দিয়ে কিনছে বড়োলোকেরা। স্বতন্ত্র নাকি তাঁর শিল্পগুণ। কেন ? কারণ , পাগলামো আর সৃজনশীলতা নাকি দারুণ মিলেমিশে যায় ঐ ছবিগুলোতে। সেই যে পরিচিতি পেতে আরম্ভ করল মরা ছেলেটা, আজও সেটা চলছে। লোকে বলে, সে নাকি Quintessential Misunderstood Genius. ছেলেটার নাম ?

ভিনসেন্ট্ ভ্যান গগ্।

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day