ডিমাসা লোককথা, লোকসংস্কৃতিতে হারিয়ে যাওয়া সরস্বতী
5735
2
865
|   Jun 20, 2017
ডিমাসা লোককথা, লোকসংস্কৃতিতে হারিয়ে যাওয়া সরস্বতী

ড. পিংকি পুরকায়স্থ (চন্দ্রানী) নতুন দিল্লী

মানুষের গল্প একদিনের নয়। লক্ষ লক্ষ বছরের অক্লান্ত সাধনায় সে পা রাখতে পেরেছে এই আধুনিক সভ্যতায়। সময় পালটাচ্ছে, পালটাচ্ছে মানুষও । যুগ যুগ ধরে  যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সে গড়ে তুলেছিল স্বইচ্ছায়, স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায়,  সেই পরিমণ্ডলেও লেগেছে পরিবর্তনের দোলা।  চরৈবেতি মন্ত্র বুকে, পরিবর্তনের অনির্বচনীয় নেশায় অনেক অলিখিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মিথের আবরনে লুকিয়ে থাকা কালের কাহিনী আজ হারিয়ে যাবার পথে। লোকসংস্কৃতি কোন একক প্রচেষ্টা বা কৃতির ফসল নয়। সমাজ জীবনে সমষ্টির যৌথ প্রয়াসে যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের  জন্ম হয় তাকেই বলে লোকসংস্কৃতি। গবেষকেরা লোকসংস্কৃতি আলোচনার ক্ষেত্রে নৃতত্ব, সমাজতত্ব, ইতিহাস, পুরাতত্ব, সাহিত্য, নন্দনতত্ব, ভাষাতত্ব,ভূতত্ব, ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকে একত্রিত  করে বিভিন্ন ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করেন ও তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন। মানুষের অনন্ত  জিজ্ঞাসার আভ্যন্তরীণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লোকসংস্কৃতির চারটি বিশেষ বর্গ রয়েছে, (১) অদৃশ্য শক্তি (২) ম্যাজিক বা যাদু (৩) টোটেম ও ট্যাবু (৪) লোকাচার ও লোকসংস্কার।   আর এই প্রত্যেকটি বর্গেরই ভিত্তি জুড়ে রয়েছে, কিছু গল্প। গল্প বলা ও শোনার রীতি অভ্যাস প্রচলিত ছিল সুদূর অতীত  কাল থেকেই । গল্পগুলো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত মুখে মুখে। সব গল্পই যে গদ্যাকারে বলা হত তা কিন্তু নয়, কখনও কখনও তা হত ছন্দোবদ্ধ, কখনও বা গানের সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়ত মানুষের অন্তরমনে। লোককাহিনীর স্রষ্টা হল মানুষের সৃষ্টিশীল মন। আর মিথের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা, কোন প্রাকৃতিক ঘটনার অপ্রাকৃতিক স্বরূপ, অথবা ইতিহাসের কোন অলিখিত ঘটনার  বাস্তবিক চোরাস্রোত  ।  

উত্তরপূর্ব ভারতের জনজাতিদের লোককথায় এমন কতগুলি বৈশিষ্ট আছে, যা ভারতের অন্যান্য স্থানের লোককথায় তুলনায় একান্তই দুর্লভ। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপের উৎপত্তি ও নামাকরন  সম্পর্কে লোককথার মধ্যদিয়ে ধরা দেয় এখানে মানব সমাজও প্রকৃতির নিকটতম সম্পর্ক। উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে আসাম এক বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজ্য, তারই এক জিলা, কাছাড়। ব্রিটিশ শাসনের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত উত্তরকাছাড় ও কাছাড়ের শাসনভার ন্যস্ত ছিল ডিমাসা রাজ পরিবারের উপরেই। এর আগে ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন শ্রীহট্ট কাছাড়, ত্রিপুরার বেশ কিছু অংশ যেমন কৈলাশহর- ধর্মনগর ও তাদের অধীনস্ত হয়ে পড়ে।  এখনও  শ্রীহট্ট- কাছাড়- ত্রিপুরার বাঙালী সমাজে সাবিত্রী ব্রত, গাড়ৈ ব্রত এবং অম্বুবাচীতে জুম চালের  বিশেষ মর্যাদা সেই সময়েরই ইঙ্গিত বাহক।  ১৩দশ শতাব্দীতে আহোম অতিক্রমনের আগ পর্যন্ত আসাম,  উত্তরবঙ্গ, অরুণাচল প্রদেশে একনাগাড়ে এদেরই রাজত্ব ছিল। ডিমাসা লোককথা অনুসারে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম এবং আদিবাসী রাজকন্যা হিড়িম্বা পুত্র ঘটোৎকচই নাকি, এই রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। হিড়িম্বার বংশধর হিসাবে এরা নিজেকে হিড়িম্বাসা এবং রাজ্যকে হেড়ম্ব রাজ্য নামে অবিহিত করে থাকেন। অথচ জনশ্রুতি অনুসারে, সরস্বতী উপত্যকার হিমাচল প্রদেশে বাসস্থান ছিল হিড়িম্বার এবং হিমাচল প্রদেশের কুল্লুতে অবস্থিত হিড়িম্বা মন্দির সেই লোককাহিনীর সাক্ষ্য বহন  করে চলেছে আজ ও। 

ডিমাসা লোক কথা অনুসারে, প্রাকবৈদিক যুগে তাদের নাম ছিল পানীসা। তারা লিঙ্গ এবং যোনিপূজক জনগোষ্টি। বেদ, রামায়ণ, এবং বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে, সেই সময় লিঙ্গপূজা প্রচলিত ছিল দৈত্য, দানব, অসুর, রক্ষ ইত্যাদি অনার্য জনগোষ্টিতে। ডিমাসারা হিমালয় পর্বতমালাকে তাদের আদি উপাস্য শিবের স্বরূপ বলেই মনে করেন। তাদের মতে জগতের সৃষ্টি, শিব ও শক্তির মিলনেই সংগঠিত হয়েছে। ডিমাসারা শিবকে “শিবরাই” নামে সম্বোধন করেন। উল্লেখনীয় বিষয় হল, শব্দটি গড়ে উঠেছে (শিব + বরাই) দুটো শব্দের সংমিশ্রনে এবং ডিমাসা ভাষায় বরাই শব্দের অর্থ পর্বত।  এই জনগোষ্টির কাছে কামাখ্যা শব্দের অর্থও চিরাচরিত ধারনা থেকে ভিন্ন। তাদের মতে “কামাই-খো” শব্দের সংস্কৃত রূপ কামাখ্যা। ডিমাসা ভাষায় “কামাই” শব্দের অর্থ অন্তরযামিনী, “খো” শব্দের অর্থ মন্দির। 

একই ভাবে হরপ্পা শব্দের প্রাকৃত রূপ বলে চিহ্নিত হারাউপ্পা শব্দটি গঠিত হয়েছে দুটো ডিমাসা শব্দ “হা” এবং “রাউপ্পা”র সন্ধিতে। হা শব্দের অর্থ ভূমি, রাউপ্পা শব্দের অর্থ মরু। ডিমাসাদের মতে সরস্বতী নদীর আদি নাম “সারস্বাতী” ( সার= ধারা, স্বা= সমুদ্র পর্যন্ত, তী= নদী), যা তাদেরই নামাকরন। ছোট ছোট পাহাড়ি নদী, উপনদী , শাখানদীরা  নিজস্ব পরিচয় ধরে রেখে সমুদ্রে সব সময় পৌঁছাতে পারেনা অথচ দেখার মতন বিষয় হল, আদি ডিমাসারা সরস্বতী নদীর সম্পূর্ণ গতিপথ জানতেন, যা লুপ্ত হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে।  ডিমাসা ভাষায় “যমুনা”নদী যমুনাই নামে পরিচিত ( য+ মু+ নাই), এবং এই শব্দের অর্থ সেই জলধারা, যা শুকিয়ে যাওয়ার পর আবার পুনর্জীবিত হয়েছে।  তাই কোথাও যেন মনে হয় , এই জনগোষ্টির যোগ রয়েছে হারপ্পা সভ্যতার লিঙ্গ যোনি পূজক অনার্য আদিবাসী জনগোষ্টির সাথে। যাদের বিস্তৃতি সেই সময়, সরস্বতী নদীর তীর ঘেঁষে দৃঢ়তার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছে হিমাচল অব্দি।  

ডিমাসা শব্দের অর্থ হল বড় জলধারার সন্তান (ডি= জল,  মা= বড়, সা=সন্তান)। ডিমাসা লোক কথা অনুসারে, ডিমাসা সংস্কৃতির জন্ম, কোন বিশাল জলধারাকে কেন্দ্র করে। তারপর  পরিবেশগত বিভিন্ন কারনে তাদের জলের উৎস শুকিয়ে যেতে লাগলে এবং শস্যশ্যামলা ভূমি, মরুভূমিতে রূপান্তরিত হলে, তারা নিজের জন্মভূমি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।  বছরের পর বছর, মাইলের পর মাইল অতিক্রম করার পর এসে পৌঁছালেন এক স্বপ্নময় দুনিয়ায়, যেখানে নিজ শাখা প্রশাখা নিয়ে সমুদ্রে মিলিত হচ্ছে দুটো বিশাল নদী, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র। সেখানে কিছুদিন বসবাস করার পর, তারা আবার বেরিয়ে পড়লেন আরও সুন্দর, সুচারু  বাসভূমির সন্ধানে। কয়েকমাসের যাত্রার পর পা রাখলেন এক মনোরম বনভূমিতে, যেখানে পশুপাখিদের কলকাকলীতে দিন রাত মুখরিত। সেখানে ভিত্তি স্থাপনের পর পরই উত্তরপূর্ব ভারত হয়ে উঠলো তাদের একান্ত আপন।

ডিমাসা গবেষকদের মতে, তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া জন্মভূমি সরস্বতী উপত্যকাই আর এরা সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার আদি বিন্দু, যা সঙ্কীর্ণ হতে হতে আজ হারিয়ে যাবার পথে। প্রয়োজন তাদের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগকে আরও গভীর ভাবে খতিয়ে দেখার, তাহলে হয়তো আমাদের এই ভারতভূমির অনেক অজানা ইতিহাসই উঠে আসবে, মিথের আবরণ ভেদ করে।

তথ্যসূত্রঃ

১) বরাকে জনবিন্যাসের মূল সূত্র, ভক্তিমাধব চট্টোপাধ্যায় (http://www.unishemay.org/html/bengali-geography.htm)।

২)  ডিমাসারা আমোদপ্রিয় জাতি, দৈনিক ভোরের ডাক, ঢাকা, বাংলাদেশ (২২ আগস্ট, ২০১৫) ।

৩) লোকসংস্কৃতিঃ নানা প্রসঙ্গ, ড. নির্মল দাশ, অক্ষর পাবলিকেশনস, ত্রিপুরা (২০০৮)।

৪) ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ড. নির্মল দাশ, অক্ষর পাবলিকেশনস, ত্রিপুরা (২০০৩)।

৫) উত্তর পূর্বাঞ্চলের সংস্কৃতি বৈচিত্র্য, বীণা মিশ্র, পুনশ্চ, কলকাতা(২০০৮)।

৬) দ্যা ডিমাসাস অ্যান্ড দ্যা এনসিয়্যান্ট হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া, উত্তম চাঁদ বর্মন, শিলচর, আসাম (২০১১)। 

পরিচিতি

ড. পিংকি পুরকায়স্থ (চন্দ্রানী) : পিংকি পুরকায়স্থ (চন্দ্রানী) জন্মসূত্রে শিলচর, আসামের মেয়ে এবং বৈবাহিক সূত্রে বসবাস করছেন নতুন দিল্লীতে। নৃতত্ব সাম্মানিক বিষয় সহ স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার  পর চন্দ্রানী, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে এম এস সি এবং পিএচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ইজেনাস নামের একটি ই-জার্নালে ম্যানেজিং এডিটার এবং যমুনায় জলদূষণের উপরে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। 

 

 

 

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day