একটি মেয়ের গল্প : ৩ : ধারাবাহিক উপন্যাস
4732
3
|   Jul 18, 2017
একটি মেয়ের গল্প : ৩ : ধারাবাহিক উপন্যাস

 এই ঘটনা প্রথম ছিলনা রিয়ার জীবনে, যেদিন নববধূ রূপে গৃহপ্রবেশ ঘটেছিল তার   সেদিন থেকে এই ধরনের ঘটনার সূত্রপাত। সেদিন থেকেই শাশুড়ি মায়ের এমন ব্যবহার তার প্রতি,   সব মেয়ের মত শুভ রাত্রির অনুষ্ঠানকে ঘিরে তার মনেও ছিল স্বপ্ন, ভয়, কৌতূহল আর এক অদ্ভুত লজ্জা মেশানো ভালোলাগা, সেই শুভরাত্রিটাই হোল না,  সেই রাতেও গ্রহন লাগিয়ে দেয়া হোল,  অষ্ট মঙ্গলার দিন, স্বামীকে নিয়ে বাপের বাড়ী যাবার যে নিয়ম সেই বিষয়টাকে কেন্দ্র করেও কম দুঃখ দেয়া হয় নি রিয়া কে, সে বোবার মতন সয়ে গেছে সব।

মায়ের এক্সিডেন্টের সময় বেশ কয়েকদিন ওকে বাবার বাড়ী যাওয়া আসা করতে হয়, মায়ের অসুস্থতা নিয়ে সে এতোটাই ভেঙে পড়েছিল যে শাশুড়িমা কে আপন ভেবে উনার কাঁধে মাথা রেখে খুব কেঁদে ছিল,  কিন্তু  তবু ও মহিলায় মনে একফুটো মায়া জন্মায় নি।  উনি রিয়ার অসুস্থ মা কে নিয়েও কম খারাপ কথা বলেন নি।  রিয়া  স্পষ্ট বুঝতে পারে, ছেলেকে নিজের হাতে  রাখতেই ওনারা বিয়েতে সম্মতি দেয়ার অভিনয় করেছিলেন। 

 বিয়ের পর প্রথম বার যেদিন রিয়ার  বাবা মা কাপড় চোপড় ফল মিষ্টি ইত্যাদি নিয়ে ওদের বাড়ী বেড়াতে এসেছিলেন, সেদিন শ্বশুর শাশুড়ি একজোট হয়ে রিয়ার মা বাবাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন, রিয়ার গায়ে হাত পর্যন্ত তোলা হয় নিখিলের অনুপস্থিতিতে।  সব জেনে শুনেও  নিখিল চুপ করে থাকে , রিয়ার জন্যে তার  স্পষ্ট নির্দেশ,  সহ্য না করতে পারলে চলে যাও।

 তার গায়ের রঙ, চেহারা, গড়ন থেকে শুরু করে বিয়ের বেনারসী, এমনকি জুতো- রুমাল পর্যন্ত, বাবার দেয়া  ফার্নিচার থেকে নিজের কেনা ভ্যানিটি ব্যাগ পর্যন্ত এমন কোন জিনিস নেই, যা বাদ গিয়েছে শাশুড়ি মায়ের খোটার তালিকা থেকে।  মাঝে মাঝে রিয়ার মনে হয় তার অস্তিত্বটাই  উনার অপছন্দের।  উনি তাকে ভিখিরির সাথে তুলনা করতেও বাকী রাখেন নি  অথচ সে নিজের বাড়ীতে ছিল রাজ নন্দিনীর ভুমিকায়।

রিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারে, তার আত্মবিশ্বাসে ভাঙন ধরছে। যে পরিবারকে সে আপন করতে  এসেছিল সেই পরিবারের অবহেলা তার মনে সারাবেলা বৃষ্টি ঝরায়। দিন দুয়েক আগে বাবা এসেছিলেন রিয়া কে দেখে যেতে, ওর খোঁজ খবর নিতে, তাও মিনিট দশেকের জন্যেই, এরই মধ্যে রিয়াকে শুনতে হোল  বাবাকে বোল এখানে না আসতে আর। রিয়া মনে বড্ড আঘাত পায়, নিখিল কে বলে। নিখিল মায়ের বিষয়ে কোন কথা শুনতেই নারাজ, উল্টো রিয়ার বুকে সে ঢেলে দেয় এক চরম ব্যাথার বিষ।

রিয়া বুঝে নিখিল মাকে এতো এতো , এতো বেশী ভালো বাসে যে, উনি অন্যায় ব্যবহার করতে পারেন সেটা মেনে নেয়া তো দূর, ভাবতে ও পারেনা।  সত্যি সত্যিই উনি খারাপ মহিলা নন,  কিন্ত কেন জানি রিয়ার সাথে এমন হয়ে যান, রিয়া নিখিল কে একসাথে দেখলে সহ্যই করতে পারেন না। কখনো কখনো বড্ড মায়া হয় রিয়ার, ভদ্রমহিলার বাবা মারা গিয়েছিলেন শৈশবে, তাই একমাত্র সন্তানের মধ্যেই খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের বাবাকে চিরকাল, আর ছেলেকে হারানোর ভয়েই হয়তো ওর সাথে এমন বাজে ব্যবহার করতেও উনার বুকে বাজে না।  কিন্তু রিয়ারও যে উপায় নেই, অসুখে বিসুখে ওকে কেউ দেখে না, কেউ হাত টা ও বাড়িয়ে দেয় না, ডাক্তার পর্যন্ত  দেখাতে চায় না। শাশুড়িমা সোজাসুজিই বলেন, বউ মরে গেলেও  কিছু না, বউ মরে গেলে বউ পাওয়া যায়।  মা বাবার সাহায্য নিয়ে তিন তিনটে বার নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছে রিয়া, অথচ নিখিলের কোন দুঃখ নেই এই বিষয়ে, একটা সমবেদনার সুরও নেই। সে বুঝতেই পারেনা যে রিয়া  আর পারছে না, তার দম  ব���্ধ হয়ে আসছে। 

আসলেই রিয়া রাত দিন কেঁদেছে নিখিলের নিষ্ঠুরতায় অথচ রিয়া নিজেও জানেনা, সে কি চায়, সে তো নিখিলকে মন থেকে ভালবাসে, আর তাই হয়তো শত দুঃখেও নিখিলকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে পারেনা। মাঝে মাঝে মনে হয় নিখিলের বিশ্বে রিয়ার কোন অস্তিত্বই নেই।  মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয় তার অথচ মা বাবার মুখ চেয়ে পারেনা। ইতিমধ্যে নিখিলের চাকরী হয়ে যায় সুদুর মুম্বাইতে,  রিয়ার অনুরুধে এই প্রথম বার নিখিল সাহস দেখিয়ে রিয়াকে নিয়ে আসে নিজের সাথে, রিয়া স্বপ্ন সাজায় আবার নতুন করে,পুরনো কে বিদায় দিয়ে রিয়া নতুনের ঢেউয়ে গা ভাসায়।    

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day