বোরোলীন এবং আরো অনেক কিছু
1393
1
|   Aug 01, 2017
বোরোলীন এবং আরো অনেক কিছু

মানে ঠিক যে অবস্থায় সাধারনত বোরোলীনের টিউবটা শেষ হয়ে গেলে ফেলে দেওয়া হয় গড়পড়তা বাড়িতে, সেটা যদি না ফেলে তুলে নিয়ে একটু খুঁটিয়ে দেখা যায় তাহলে কী দেখবো ?

গাঢ় সবুজ রঙের একটা চাপে চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা অষ্টবক্র টিউব, তার ভেতরটা রুপোলীমত, কালো মতন কুচুনপানা খাপটা। তবে ছিপিটা কিন্তু যতই নিরীহ মাসুম দেখতে হোক, ঘরে যদি অবোধ, " যা পাই তাই সোনামুখে খাই" -মার্কা খোকা খুকি থাকে তাহলে সাধু সাবধান।

নিজে ভুক্তভোগী তো, তাই আগেভাগে বলে রাখলুম খোকা খুকির মা বাবাদের। যাই হোক যা বলছিলাম, ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া টিউবটার ভেতরবাগের দেওয়ালে যে পরিমান শুভ্র সফেদ নরম তুলতুলে অবশিষ্ট বোরোলীন চিপকে থাকে তার অর্থমূল্য মেরেকেটে খুব জোর আটানা থেকে একটাকা হতে পারে, প্রতি টিউবের দাম কুড়ি টাকা ধরে এবং সিম্পল ঐকিক নিয়মে।

ছোটোবেলার অনেকগুলো শীতের দুপুর এই "সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রীমের" সুগন্ধে ভরপুর হয়ে আছে। উত্তুরে বাতাস ডানা মেললেই, চামড়ায় খসখস, ঠোঁটে চড়চড় শুরু হওয়ার আগেই বাবা ডজন খানেক বোরোলীন এবং চেশমী অথবা সোনালী (ঠিক মনে নেই) গ্লিসারিন সাবানের তিনটের প্যাকেট নিয়ে আসতো। এই সাবানের প্যাকেটটা ঠিক কাগজের লম্বাটে বাক্স টাইপের হত। "জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা" __তাই ওই খাপগুলো টীপের পাতা, কাঁচের চুড়ি এগুলো রাখতে সুন্দর কাজে লাগিয়ে দিতাম।

বোরোলীন যে কতরকমের কাজে ব্যবহার হত/হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরনের জন্য টিভি তে পার্বতী এ.কে.এ. সাক্ষী তনওয়ার-এর অ্যাড-টি রেফার করব (সবগুলোর মধ্যে এটা আমার বেশী ভালো লেগেছিল)। হাঁটু গোড়ালীফাটা কাটা ছেঁড়া ঠোঁটফাটা অব্দি ঠিক আছে কিন্তু মা যখন ওই চটচটে মিরাকল্ কিওর জোর করে মুখে মাখিয়ে দিত তখন বোরোলীন কোম্পানীর ওপর কেস ঠুকে দিতে ইচ্ছে করত।

এইখানে বলে রাখি স্বদেশী আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নামী ব্যাবসায়ী শ্রী গৌরমোহন দত্ত, ১৯২৯ সালে সম্পূর্ণ দেশী এই ম্যাজিক ক্রীম দেশের লোকের হাতে তুলে দেন। আজও কলকাতা বেসড্ জি. ডি ফার্মাসিউটিক্যাল থেকেই দেশের লক্ষ লক্ষ লোকের ড্রেসিংটেবলের ড্রয়ারে পৌঁছায় বোরোলীন।

তা যেটা বলছিলাম, শীতের দুপুরে মাকে এবং এর আগে ঠাকুমাকে দিদিমাকেও দেখতাম ছাদের নরম রোদ্দুরে গা ডুবিয়ে মাদুরে বসত গোটাকতক বোরোলীন, টুথপেস্ট, বাড়ীর ছেলেদের শেভিং ক্রীম, ব্যাথার মলম ইত্যাদি আরো কীসবের প্রায় নিঃশেষ টিউব নিয়ে। তারপর একই সাথে যত্ন এবং প্রবল ক্ষমতার প্রয়োগ করে টিউবগুলোর দেহ ছিপি দিয়ে ঘষে চলত যতক্ষণ না সেগুলোর সব জায়গাটা সমানভাবে পাতলা এবং মসৃন হচ্ছে।

যেভাবে সেভাবে করলে হবেনা, এটা একটা আর্ট। দুটো নিয়ম মানা অবশ্যকর্তব্য নইলে প্রার্থিত ফল লাভ হইব নাকো। প্রথমত যে টিউব ঘষা হচ্ছে সেটারই ছিপি ব্যবহার করতে হবে, আই রিপীট, পরকীয়া চলবেনা। দ্বিতীয় নিয়ম হল ঘষাটা শুরু করতে হবে লেজের দিক থেকে মুখের দিক অব্দি। এরপর তো মিরাকল। শেষ হয়ে যাওয়া যে টিউবটা ফেলে দিতে যাচ্ছিলেন সেটা হেসেখেলে আরো দিনদশেক চলবে। তবে টুথপেস্টের ক্ষেত্রে, কারোর দিনে দুবার দাঁত মাজার বদ অভ্যেস থাকলে ওয়ারান্টি ঘ্যাঁচ করে হাফ হয়ে যাবে।

ব্যপারটাকে খানিকটা স্লিমিং টেকনিক বলে ভাবতে পারেন। হেথা হোথা অস্থানে কুস্থানে জমে থাকা চর্বিগুলোকে ঘষে ঘষে ধরুন এক জায়গায় জমা করলেন তারপর ___ নাহ্ থাক ___ সেগুলো বার করাটা নিয়ে আলোচনায় গিয়ে কাম না���। বোরোলীনেই ফিরে আসি। যা বলছিলাম, তারপর তো সেইসব শীতের বোরোলীনমাখা দুপুর পেরিয়ে বড় হলাম, নিজের সংসার হল, বিষ্ণুমন্ত বর হল (লক্ষীমন্তর পুরুষভার্সন আর কী .. কারোর কাছে বেটার নাম থাকলে সাপ্লাই দিয়ো) , গুন্ডালগ্নে খোকা হল।

কিন্তু আমি সেই ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছি। লুকিয়ে লুকিয়ে দোমড়ানো মোচড়ানো টিউবগুলো নিয়ে এক মনে বসে ঘষে যাই। ল্যাজা থেকে মুড়ো , যে যার ছিপি দিয়ে। কত্তামশাই দেখতে পেলে রে রে করে তাড়া করে, মাঝেমাঝে কিপটে বলে খেপায়।

আসলে কি জানেন, তখন ছোটোবেলায় বুঝতামনা। কখনো হাসি পেত কখনো বা মজার ছলে হাত লাগাতাম। আজ বুঝি___ পঁচিশ তিরিশ বছর আগে প্রফেসরির সামান্য মাইনে দিয়ে, মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরের সারা মাসের মুদির দোকান, সব্জি বাজার, ছেলেমেয়ের ভাইবোনের পড়ার খরচ, ওষুধ পথ্য, দায় দায়িত্ব, লোক লৌকিকতা সব সেরে মাসের শেষে পকেটের হাল ওই দোমড়ানো টিউবের মতই হয়ে যেত। পরের মাসের মাইনে না হওয়া অব্দি শেষের কটা দিন ওই টিউব নিঙড়ে একটাকার বোরোলীন চেঁছে বার করার মত পকেট নিঙড়ে বা বোকাভাঁড় ভেঙ্গে বেরোনো কয়েন , পাঁচটাকা, দশটাকার নোটগুলো দিয়ে এক একটা দিন টেনে হিঁচড়ে পার করতে হত।

দুপুর রোদে রিক্সা চাপার বিলাসিতা ত্যাগ করে, পুরোনো সোয়েটারের গুটুলীপাকানো ববলিং গুলো নখে করে খুঁটে তুলে

"এই তো আর ততো পুরোনো লাগছেনা, এই শীতটা চলে যাবে" __বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে, কদিন পেট খারাপের দোহাইতে দুশ গ্রাম মাছ মাংস কম কিনে চালিয়ে নেওয়ার ম্যাজিক পাওয়ার কীকরে মধ্যবিত্ত মা বাবাগুলোর থাকে কে জানে !

অনেকটা বোরোলীনমার্কা সর্বদুঃখহরণ ক্ষমতা।

আজ কেন, অনেকদিন আগেই অভাব ঘুচেছে। শুধু কুড়ি টাকার বেরোলীন নয় আরো নামীদামী কোম্পানীর ক্রিমে সাজঘরের শোভা বেড়েছে, কিন্তু ওই যে __ যখনই নরম নরম দোমড়ানো টিউবগুলো নিশির মত ডাকে তখন আমার মধ্যবিত্ত সত্তাটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায়। শেষ বিন্দু অব্দি বার করতেই হবে! নষ্ট করা কিছুতেই চলবেনা। রাতদিন সাতদিন খেটে তার ওপর ট্যাক্স কেটে পাওয়া পয়সার বোরোলীন। আমার সবটুকুনি চাই । আমার ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তিলে তিলে জমাতে চাই। বর্তমান যখন বলে ভবিষ্যতের জন্য গাড়ী চাই, ফ্ল্যাট চাই তখন মনের কোনে পড়ে থাকা মধ্যবিত্ত অতীত থেকে ভারতচন্দ্রের ঈশ্বরী পাটনী বলে ওঠে,

" আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"

_______ অ্যান্ড অফকোর্স .. বোরোলীন-এ ।

-----সমাপ্ত-----

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day