অকৃতজ্ঞ 
4303
6
1
|   Apr 17, 2017
অকৃতজ্ঞ 

তুমি করেছো কি আমার জন্য?? এই একটা প্রশ্নের আগে সুমিতা মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সত্যিই তো আজ অবধি সে কি করেছে?? বিয়ের পর থেকে আজকের এই মুহূর্ত পর্য্যন্ত সত্যি  সে কি কিছুই করতে পেরেছে...নাকি সময়ের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে যেখানে কেউ না কেউ তাকে বার বার এই প্রশ্ন করেছে...কি করেছো আমার জন্য ?

 সুমিতা তো গান গাইতে খুব ভালোবাসতো, নানান রকম রং দিয়ে ছবি আঁকতেও, কিন্তু শশুর বাড়িতে এসে কোনোদিন সে কি গান গেয়েছিল, কোনোদিন সে কি একটি বারের জন্যও রং তুলি তে হাত দিয়েছিল না কি সকাল সন্ধে রান্না ঘর আর একচিলতে ঘরটার ভেতর নিজের দমবন্ধ হতে হতে বার বার চোখের জল মুছেছিল নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে। 

আসলে সে তো কবেই মরে গেছল সে নিজেই জানতে পারে নি। প্রতিপলে প্রতিমুহূর্তে লাঞ্চিত অপমানিত সুমিতা বেঁচে ছিল কি? তার রূপ রং কিছুই তো কারো পছন্দ হয় নি কোনোদিন । বারেবারে তুলনায় হেরে যাওয়া সুমিতা নিজেকে তো কবেই গুটিয়ে নিয়েছিল নিজের খোলসের আড়ালে।

 শুধু রাতের আঁধারে যখন পুরো পৃথিবীটা শান্ত হয়ে যেত, একটুকরো ছাতের কোনায় চুপচাপ বসে গুনগুনিয়ে গান গাইতো সে। চোখের জলের আড়াল থেকে আবছা হয়ে যাওয়া বাবার মুখটা দেখতে পেতো সে...বাবাকে প্রশ্ন করতো সুমিতা.. এতো কষ্ট কেন বাবা আমার। বাবা বলতেন একটু সহ্য কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।

 কিন্তু সেই ঠিক কবে হলো আজ আর মনে পড়ে কি?সে কি সত্যি ঠিক হয়েছিলো! না কি সময় ধুইয়ে মুছিয়ে সবটুকুকে নিজের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছিল। সে তো সবার  সুরে সুর মেলাতে মেলাতে নিজের সত্বার বিসর্জন নিজের হাতেই করে দিয়েছিল।  তবুও কোনদিন নিজের জন্য দুমুহূর্ত সে পেয়েছিলো কি? 

ঘরে বাইরে অবিরত যুঝতে যুঝতে কখন যে তার সিরদাঁড়াটাই অকেজো হয়ে গেছল সে টাও তো সে বুঝলো অনেক পরে। ডাক্তারের দীর্ঘ ভাষনের পরে একটাও কথা সেদিন তো সে বলতে পারেনি। সেদিন ও তো সাহস করে ডাক্তার কে বলতে পারেনি, আপনি কি জানেন কি ভাবে কি হয়েছে!  কি করে বলবে তাকে যে কতদিন না খেয়েদেয়ে সে চাকরি আর ঘরের মাঝে তাল মেলাতে মেলাতে নিঃস্ব হয়েছে প্রতিমুহুর্তে !

 কিন্তু আজ যা হলো সেটাও কি সে আগে জানতো না? সে কি জানতো না যে প্রতিবারেই তার মূল্যাঙ্কন এভাবেই হয়। আজ অবধি সে কি পেয়েছে কোনোদিন তার হিসেব সে কি করেছে.....তাহলে আজ কাঁদতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? আজ কেন গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে ....হ্যা হ্যা আমি কিছু করতে পারিনি কোনোদিন। আর করতে চাইও না। সময় এর জবাব দেবে। 

দুচোখের জলে ভেসে যাওয়া সুমিতা সেই পুরোনো দিনগুলোকে এক এক করে চোখের সামনে সাজাতে লাগলো। সেই কিশোরী মেয়েটার বিয়ের রাত থেকে আজকের ঘটনাগুলো সাজাতে সাজাতে কখন যে দুচোখ বুজে এসেছে নিজেও বুঝতে পারলো কই! সকালে ঘুম ভাঙল কাজের লোকের আওয়াজে।

 আজ ঠাকুরঘরে পুজোয় বসে ঠাকুরকে অনেক দিন পর কাঁদতে কাঁদতে বললো ....তুমি কি এর বিচার এখনো করবে না ঠাকুর! আসলে এই চালাক ধূর্ত মানুষগুলোর তুমি কি কোনো হিসেব করবে না?নিজের জীবন টার এক এক টা পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সুমিতা নিজের সংঘর্ষের সেই পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো কে পরিষ্কার দেখতে পেলো। এক এক করে নিজের সমস্ত গয়না গাটি মদ্যপ অমানুষ বিয়ে হওয়া লোকটার হাতে তুলে দিতে দিতে কখন যে তার চোখের জল শুকিয়ে সে আগুনের গোলা হয়ে গেছে....সে নিজেও তো জানলো অনেক পরে।

 না হলে বারবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া সেই নির্মম অসভ্য লোকটাকে সেদিন কোথা থেকে এতো শক্তি পেলো সে তাকে প্রত্যাখান করে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করার। আজ সুমিতা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না আর। একটু একটু করে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, না ঘুমিয়ে, না নিজের কথা ভেবে আজ আর কোনো কিছুই স্পর্শ করে কি তাকে! 

সে তো আজকের নারী। সে তো কোনোদিন মহিয়সী হতে চায় নি। সে তো সারাদিন মুখে হাসিটুকু রেখে সবার তালে তাল মিলিয়ে নিজের সুর ভুলে গেছে বারবার। সে তো ভুলতে চেয়েছে....সে গান গাইতো ভালো, ছবি আকতো নদী, ঝর্ণা, ফুলের। সে তো বুক ভরে সবাইকে খুব ভালোবাসতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাও বারবার সব কিছু করার শেষ অধ্যায়ে এই প্রশ্নের মুখোমুখী আর কতদিন হবে সে.....কি করেছো তুমি আমার জন্য?

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day