কেয়াদি
2453
11
|   Jul 14, 2017
কেয়াদি

আমি আসলে কেয়াদি কে কথা দিয়েছিলাম, যে তোমাকে নিয়ে কোনোদিন কিছু লিখবো না।  আমাকে হয়তো মনের ভুলে বা সমব্যথী ভেবে সব কিছু বলে কেমন যেন অসহায়ের মতো একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো....এই দুষ্টু মেয়ে , শুনেছি তুই নাকি কিসব লিখিস টিখিস ! তা আমার এসব ছাই পাশ কোনোদিন যেন লিখতে যাস না। লিখিস যদি কোনো রাজকন্যা রাজকুমার কে নিয়ে লিখিস.... আমার মত এত সাধারণ মেয়ের কথা কে পড়বে বল ?? শুধু শুধু তোর সময় নষ্ট হবে ।

আমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে কেয়াদির গলা জড়িয়ে বলেছিলাম, না গো না। আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই আমি  তোমায়  নিয়ে লিখবো ! কেয়াদি বিশ্বাস করলো হয়তো, তাই আশস্ত হয়ে চা করতে দৌড়োলো। ভালোই হলো, আমি নিজের  চোখের জল পৌঁছার সময় টা যে পেয়ে গেলাম। না হলে হয়তো কেয়াদির সামনেই কেঁদে ফেলতাম।

খুব সাধারণ দেখতে কেয়াদি অসাধারন গান গাইতে পারতো। পড়াশোনার সাথে সাথে কেয়াদি একটা ছোট গানের স্কুল চালাতো। বাবা , মা, ছোট দুই ভাই আর কেয়াদি ... কলকাতায় ওদের ছোট বাড়িটায় সুখের সাধন খুব একটা বেশী হয়তো ছিল না কিন্তু মানুষ গুলো একে অপরকে খুব ভালোবাসত। নিজেদের মধ্যেই খুশী থাকতে জানতো তারা।

কেয়াদির বাবা মা দুজনেই স্কুলে পড়াতেন। বাড়ির কাজের সাথে সাথে ছোট দুই ভাইয়ের অনেকটা দেখাশোনাই কেয়াদি কে করতে হোতো। সারাদিনের পরে সবাই রাতে খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া আর একসাথে হবার সময় খুব কম পেতো। 

এইভাবেই হাসি খুশি মান অভিমানে দিনগুলো বেশ ভালই কাটছিল। যথারীতি অন্য আর পাঁচজনের মতো কেয়াদির বিয়ে হয়ে গেলো এম এ পড়তে পড়তে।

বাবা মার এক ছেলে .... বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে কেয়াদি শ্বশুর বাড়ি পা রাখলো। গন্ডগোল টা শুরু হলো সেদিন থেকেই। কেয়াদির শাশুড়ি কি জানি কেন, প্রথম দিন থেকেই কেয়াদির সাথে যথেষ্ট খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে দিলেন

দুধে আলতায় পা দিয়ে শাঁখ আর উলু ধ্বনির মধ্যে দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে কেয়াদির নতুন জীবন শুরু হলো। সবার প্রথমে শাশুড়ি, পরে একে একে সবাই আশীর্বাদ করলো।  দামী দামী গয়না আর অনেক কিছু উপহারে নতুন বৌ বেশে কেয়াদি অভিভূত হয়ে গেল। 

অনুষ্ঠানের শেষে কেয়াদির শাশুড়ি সমস্ত কিছু নিয়ে যেই যেতে যাবেন, দিদি শাশুড়ি বাধা দিলেন... একি বৌমা ! তুমি এসব কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? ওদের জিনিষ এখানেই থাকবে।  দু তিনজন মিলে সব গুছিয়ে দাও এখানেই। দু দুটো আলমারী আছে যে ঘরে , সব জিনিস ভালো ভাবে রাখা যাবে। 

সেই বোধ হয় সূত্রপাত... এর পর দিনে দিনে আরো নানান অজুহাতে কেয়াদিকে অপদস্থ করতে লাগলেন তিনি। মুখ বুজে সবই সহ্য করছিল কেয়াদি।। ঝামেলা লাগলো  যেদিন হঠাৎ খুব জ্বরে সকালে উঠতে পারল না কেয়াদি।  শাশুড়ি মা এসে নানান টীকা টিপ্পনী তো করলেনই উল্টে বলে গেলেন , শোনো বাপু এরকম অসুস্থ বউ নিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। বাবা কে ফোন করে নিয়ে যেতে বলো। 

সুস্থ হলে তবেই এসো। জ্বর গায়ে কেয়াদি বাবার সাথে বাপের বাড়ি চলে গেলো। কেউ যাবার আগে খোঁজ নিতেও এলো না সে জল টুকুও খেয়েছে কিনা !অসুস্থ কেয়াদি বাবার সাথে বাড়ী আসার পর প্রায় পাঁচ ছ দিন পর কেয়াদির স্বামীর ফোন এল । তখন কেয়াদি অনেকটাই সুস্থ। 

তারও তিন দিন পর কেয়াদির স্বামী এসে বাড়ি নিয়ে গেলেন কেয়াদিকে। এতদিনের জ্বরে কাতর কেয়াদির কপালে কিন্তু কোনো আরাম জুটলো না , কষ্ট করেই পরদিন থেকেই কেয়াদি  বাড়ির কাজ করা শুরু করে দিলো।

মুখ বুজে সারাদিন কাজ করার পরেও কেয়াদির কপালে কখনোই দুদন্ড শান্তির মুহূর্ত ভগবান বোধ হয় লিখেও দেন নি। কোনো ভাবেই কেয়াদির শাশুড়ি কেয়াদিকে বাক্য যন্ত্রনায় বিঁধতে ছাড়তেন না।  তাও যে ভাবে হোক চলছিলো.... আর সবচেয়ে বড় কথা কেয়াদি বিয়ের কিছুদিন পরেই  কেয়াদি বুঝতে পেরেছিলো যে ওনার স্বামীও ওনাকে মোটেই পছন্দ করেন না।

এইভাবেই দিন গুলো কেটে যাচ্ছিল... দুঃখে কষ্টে কেয়াদি নিজের দিকে না তাকিয়ে সংসারের পেছনেই নিজের জীবন কাটাতে শুরু করে দিয়েছিল। 

অনেক কিছু না চাইতেও মেয়েদের যে সব কিছু  মানিয়ে নিতে হয় ...  আঘাত পেতে পেতে কেয়াদি চুপচাপ সারাদিন কাজ করে সংসারের এক কোনে পড়ে থাকতো।  সময় মন্থর গতিতে কেটে যাচ্ছিল। কেয়াদি বাচ্ছা খুব ভালোবাসত, কিন্তু কেয়াদির স্বামী নাকি কোনোদিনই বাচ্ছা হোক চাইতেন না। কেয়াদির তো সাহস ও ছিলো না নিজের মনের কথা প্রকাশ করার।

মুখ বুজে দিন কেটে যাচ্ছিল কেয়াদির

কিন্তু একদিন বাজ পড়লো হঠাৎ কেয়াদির জীবনে যেদিন ওনার স্বামী ঘোষণা করলেন ... উনি এই জীবনটা থেকে মুক্তি চান। 

প্ৰথমে কিছুই  যেন বুঝতে পারছিল না সেদিন। কোথায় যাবে কি করবে বুঝতেই একদিন কেটে গেলো। কি জানি কেন চোখের জল এক ফোঁটাও বেরোলো না সেদিন। পাথরের মত স্তদ্ধ কেয়া দি কোথায় , কি ভাবে যে সেদিন এত মনের জোর পেলো সে কথা বলতে গিয়ে আমায় কিন্তু ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিল কেয়াদি।

আমি চুপচাপ শুনতে আর পারছিলাম না। আমার নারী সত্বা নিজেকে কেয়াদির জায়গায় দাঁড় করিয়ে বারবার প্রশ্ন করছিল... তুই কি করতিস এমন একটা দিনে !

 আর আশ্চর্য সেই উত্তর টা কেয়াদি নিজেই দিলো সেদিন । ভোর রাতে বাড়ী ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে এসেছিল কেয়াদি। ডিভোর্স টা কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে গেছল। 

কেয়াদির বাবা মা  এতদিনে সব শুনে শুনে  হয়তো আগেই আন্দাজ করেই রেখেছিল এমনটা হবে তাই অসম্ভব শান্ত হয়ে সবাই মিলে কেয়াদির পাশে দাঁড়ালো তারা। 

কেয়াদি সেই গানের স্কুলে নিজেকে ডুবিয়ে দিলো পুরোপুরি ভাবে আবার।।ভাইয়েরা অনেকটাই বড় হয়ে গেছল  তখন। তাদের সামলানোর দায়িত্বও আর ছিলো না কেয়াদির ।

আমার সাথে আলাপ হলো ওই গানের স্কুলেই। গান শেখানোর ফাঁকে ফাঁকে কখন যেন আমাকে আপন করে নিয়েছিল কেয়াদি। আমি আমার অফিসের কাজের পরে তাই  যখন তখন পৌঁছে যেতাম কেয়াদির কাছে। 

না বলতে চেয়েও আমাকে একটু একটু করে মনের ভেতর  পর্দা  ঢাকা সব কথা   একটু  একটু  করে বলে  স্বাভাবিক হতে চেয়েছিল হয়তো কেয়া দি। 

আমি কথা দিয়েছিলাম তোমাকে , তোমায় নিয়ে আমি কোনদিন লিখবো না  .... কিন্তু রাখতে পারিনি আমি সেই কথা কেয়াদি। আমি যে তোমার মত মনের ভেতরে এত কষ্ট, এত  দুঃখ লুকিয়ে নিয়ে ঘুরতে পারিনা যে... আমার লেখার মুহূর্তে যে তারা এক এক করে সব আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। তোমার চোখের জলে ভেজা তোমার সেই মনটা  বারবার বলে তুই না লিখিস! তা হলে আমাদের  কথা লেখ না একবার। 

 আসলে  তোমার মত এমন অনেক মানুষের সাথে রোজকার পথ চলার মাঝে আমার দেখা হয় কেয়াদি। অবসর সময়ে আমি মনে মনে তাদের কাছে পৌঁছে যাই যাদের এক কালে ঘর পরিবার, সুখের সংসার সব কিছুই ছিল। 

আজ তারা জানে না তারা কেন একা ??

তারা  অপরাধ না করেই কেন আজ একা তা তারা কেউ আমাকে বলতে পারল না.... অথচ একটা কথা কি জানো যতবার যত জন কে প্রশ্ন করেছি তাদের রাগ, দুঃখ নেই কারো ওপরে? প্রত্যেকেই শান্ত হয়ে জবাব দিয়েছে ... না না আমাদেরই কোনো দোষ হবে।আমরাই আর কারো সাথে মানাতে পারি কই ?

হয়তো তাই হবে !  কখনো বৃদ্ধ বাবা মা বা কখনো পরিত্যক্তা স্ত্রী।   এই অসহায়, বয়স্ক, অসুস্থ  মানুষ গুলোর কি দোষ  আমি বুঝে পাইনি কখনো। না হলে দিনে দিনে শহরে দেশে এত বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন কি করে হঠাৎ হোলো তোমরাই বলো তো ? যারা এখানে হাত ধরে এদের পৌঁছে যাচ্ছে তারা কারা .... তাদের এত বড় করে তুলেছে যারা তারা এত অবাঞ্ছিত হোলো কি করে আমি সে উত্তর কোনো দিন খুঁজে পাইনি। 

সাতফেরা দিয়ে সাত রকমের প্রতিজ্ঞা করে কারা এরা যারা হাজার হাজার কেয়াদিকে বিনা দোষে ছেড়ে চলে যাচ্ছে দিন দিন প্রতিদিন। সে উত্তর আজও খুঁজে চলেছি আমার জীবন দিয়ে কেয়াদি। কি জানি কোনোদিন পাবো কিনা !

তাই তোমার কথা শুধু তোমার কথা রইলো কই ??

সে তো তোমার আমার অসংখ্য মেয়েদের কথা হয়ে গেলো। যারা জানলো না সর্ব গুনসম্পন্না হয়েও তাদের দোষ কোথায়?? সেই রাজকন্যে রাজপুত্তুর দেরই গল্প লিখলাম আমি কেয়াদি।

তাই প্রতিজ্ঞা ঠিক ভাঙলাম না বোধ হয়! বরং মন শক্ত করে প্রতিজ্ঞা করলাম তোমার আমার মতো মেয়েদের নিয়ে লেখার। নতুন এক সংকল্প , নতুন কিছু করার। মা বলতো , আঘাত পেয়ে পেয়েই মন টা শক্ত হয়। সেই শক্তিই সাহস যোগায়। কিন্তু কত টা আঘাত সহ্য করা যায় তা বলতে ভুলে গেছলো মা বোধ হয়। আজ মা বেঁচে থাকলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতাম হয়তো !

তাই তোমার কথা তোমার আমার মত মেয়েদের জন্যই লেখা। 

জানি তুমি রাগ করবে না... আমাকে তুমি যে অনেক ভালোবাসো .... 

তাও..... যদি ভুল করে থাকি

আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও কেয়াদি...

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day