সাঁঝবাতি
1299
|   May 26, 2017
সাঁঝবাতি

আজ যখন 'সাঁঝবাতি'র গেট খুলে ভেতরে পা রাখলাম, তখন সন্ধ্যে প্রায় হয়ে এসেছে। সামনের বারান্দায় সবাই প্রায় রয়েছে। আমার আজ একটু দেরী হয়ে গেছে।। আমি দ্রুত পায়ে বারান্দায় পৌঁছে গেলাম। এই 'সাঁঝবাতি'র সাথে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। আমি কবে, কিভাবে যে এদের সাথে জড়িয়ে গেছি তা নিজেই জানি না। কিন্তু রোজ এদের সাথে সময় না কাটালে আমার দিন কাটে না। এরা সবাই বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। কেউ দশ, কেউ পাঁচ আবার কেউ বা সদ্য দু তিন মাস আগে এসেছে।      একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছি এরা শুরু তে এসে কেউ কারো সাথে মিশতে চাই তো না, সবাই তখন একটাই কথা বলত.... আমরা দু চার দিনের জন্য এসেছি। আবার বাড়ি চলে যাবো। দিন , মাস, বছর চলে যায় কিন্তু কেউ ফিরে যায় নি এখান থেকে।

কারণ যে বা যারা এখানে রেখে যায় তারাও আর কোনোদিন আসে না। কচিত কদাচিৎ কারো ছেলে বা মেয়ে আসে হয়তো বা আরো কিছু পাবার আশায় ... কোনো paper   বা bank এর cheque এ সই করাতে। 

বাবা , মা দৌড়ে আসে সবাইকে ছুটে ছুটে বলতে যায়... আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে দেখো তোমরা.. । সবাই মনে মনে একে একে আরো নিস্তেজ হয়ে পড়ে।একটু পরেই চোখের জলে ভেসে যাওয়া মানুষ গুলোকে সান্ত্বনা দিয়ে কোনোরকমে আবার বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করি। আজ বহু বছর ধরে এই চলে আসছে। আজ পৌঁছতে একটু দেরী করে ফেলেছি। সবাই দেখলাম বেশ চিন্তিত। রীনা মাসিমা খুব অসুস্থ। একটু বয়সও হয়ে গেছে ওনার। বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন। কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখলাম, চোখ খুলে দেখলেন একবার, তারপর আমার হাত দুটো ধরে নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন আবার। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে রান্নাঘরের দিকে দৌড়োলাম, এরা সবাই পালা করে রাঁধে, কাজ করে। অসুস্থ হলে তার সব কাজ অন্য কেউ করে দেয়। কোনো রাগ অভিমান এখানে কেউ করে না। ওই জগৎ টা এরা সবাই প্রায় ছেড়ে এসেছে।  আমি পাতলা খিচুড়ি নিয়ে আবার রীনা মাসিমার পাশে এসে বসলাম । একটু একটু করে প্রায় সবটা খেয়ে নিলেন মাসিমা। জল খাইয়ে, মুখ মুছিয়ে আমি আবার বারান্দায় এলাম । এবার সবার সাথে কিছুক্ষণ গান, গল্প, হাসি,আড্ডা দেবার সময়। সবাই এই সময়টা বেশ ভালই ভাবে উপভোগ করে।এদের মধ্যে অনেকেই খুুুব ভালো গান করেন... সবেচেয়ে বয়েসে ছোট নন্দা কাকিমা খুব ভাল নজরুল গীতি করেন। অসীম কাকু ঝর ঝর করে আবৃত্তি করেন সকাল বিকেল নিজের মনেই। পারুল কাকী ঠাকুরের গান করতে ভালোবাসেন খুব। আজ আমিই প্রথম গান ধরলাম... যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি.... সবাই একে একে সুর মেলালো। সে এক অদ্ভুত পরিবেশ। সবার চোখে জল। আমি বুঝিনা এই এত সরল, সাধাসিধে মানুষ গুলোর এত কি দোষ ছিল যে তারা সংসার থেকে বিতাড়িত হলো। ছেলে, মেয়ে, স্বামী সংসার এরা কিছুই কেন পেল না।  নন্দা কাকিমার শুনেছি দিল্লী তে দু দুটো ফ্ল্যাট ছিল, ছিল বলছি কেন ,এখনো আছে। যেদিন ওনার স্বামীর শ্রাদ্ধ শান্তি মিটলো, তার না কি দুদিন পরেই দুই ছেলে আবদার করলো , মা তুমি তো এবার আমাদের কাছেই থাকবে তা হলে আর দেরি কেন!! ফ্ল্যাট এবার আমাদের নামে লিখে দাও... না হলে নাকি অনেক ঝামেলা তোমায় শুধু শুধু পোয়াতে হবে। ওনার স্বামী মৃত্যু শয্যা তে শুয়েও কাকিমা কে বারণ করেছিলেন, কিন্তু ওই যে মায়ের মন... সে কোনোদিন , কখন কোনো নিষেধ শুনেছে কি??কাকিমা দুটো ফ্ল্যাটই দুই ছেলের নামে লিখে দিলেন। একসপ্তাহ পরে ফ্ল্যাটের কায়াকল্প শুরু হলো। মার শরীর খারাপ না হয়ে যায়... তাই বন্ধ ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা মিটিং হল... সবাই মার ভালো চেয়ে দশ দিনের দিন মাকে এই 'সাঁঝবাতি'তে রেখে গেল। সে আজ প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। কোনো অজুহাতেই আর কেউ কোনোদিন আসেনি এখানে। কিন্তু আশ্চর্য এরা প্রত্যেকেই.... কেউ কোনোদিন কখনো ভুলেও নিজের নিজের ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজন কারো ওপর দোষ দেয় না। সবটাই না কি এদের নিজস্ব কর্মফল।সব সময় নির্জনে বসে সেই মানুষ গুলোরই ভালো চায় অহর্নিশি।  আমি যত দেখি তত অবাক হই।  সব কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েও এরা বেঁচে আছে... এরা এখনো সবার ভালো চায়। আমি সারাদিন স্কুলে পড়িয়ে রোজ বিকেলে এদের কাছে জীবনের নতুন পাঠ নিতে আসি।  এই পাঁচ বছর ধরে এত কিছু শিখলাম যা হয়তো কোন স্কুলে, কোনো ইউনিভার্সিটি তে শিখতে পারতাম না। এরা বঞ্চিত হয়েও জীবন যুদ্ধে হার মানে নি। তাই তো নিজেদের অজান্তেই... যেতে যেতে একলা পথে.. গাইতে গিয়ে বুক ভেঙ্গে চোখের জল বাইরে বেরিয়েছে। আমি কাউকে আজ কাঁদতে বারণ করলাম না। কাঁদুক এরা... সব পাথর চাপা দুঃখ বাইরে ভেসে যাক। আরো  কিছুদিন বাঁচুক এরা .....এই ভাবেই একে অপরের দুঃখ খুশী ভাগ করে জীবন টাকে উপভোগ করুক না ওরা। আমি নয় এতটুকু সময়, এতটুকু হাসি ওদের সাথেই ভাগ করে নি। কি বলো তোমরা....☺

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day