শুধু তোদের জন্য
12515
44
2
|   Jul 01, 2017
শুধু তোদের জন্য

আমার  দিয়া ,ঋষি

আমি জানি তোরা দুজনেই বাংলা পড়তে জানিস না,তাই এই চিঠি বাংলায় লিখলাম।  আজ অনেক সাহস করে কিছু কথা তোদের জন্য লিখতে বসলাম। অনেক কথা, অনেক মুহূর্ত লুকিয়ে আছে এই চিঠি তে।

যেদিন আমি থাকবো না এই পৃথিবীতে, সেদিন যদি খুঁজিস আমায় ... যদি মনে হয় কোনো উত্তর আজ মা থাকলে পেতাম... তার জন্যই এই পংক্তি গুলো যত্ন করে রেখে গেলাম।  আমি চাবি কাঠি এই বাক্সটার তোদের দুজনকেই আলাদা করে দিয়ে যাবো। অনেক না বলা, না বোঝা কথা হয়তো বুঝে যাবি তোরা !

কখনও যদি খুব মন খারাপ হয়... সেদিন এই চিঠিটা কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিস। তোদের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার এক একটা মুহূর্ত , যা আমার বুকের মাঝে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি... তার চাবিকাঠি তোদের হাতে তুলে দেবো বলেই এই চিঠি।

আসলে  তোরা যখন বড় হলি ,অনেক বার, অনেক মুহূর্তে আমি তোদের কাছে বলতে চেয়েছি... একটু হাল্কা হবো বলে। অনেক বার তোদের বলা নানান কথার মাঝে আমি বলে উঠতে চেয়েছি বারবার। কিন্তু ওই যে আমি তো মা... বারবার বলতে চেয়েও তোদের কোমল, নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ বন্ধ রেখেছি।  মনে হয়েছে তোরা যদি খুব কষ্ট পাস , যদি তোরা ভেঙ্গে পড়িস ,তাই সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম

আরো যেদিন বড়ো হয়ে যাবি, সব বুঝতে শিখবি সেদিনের ভরসায়  বুকের মাঝে সব জমিয়ে রেখেছিলাম।

কেন কি সুখ দুঃখের  যে মুহূর্তগুলো আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম ,সে কথা বলার জন্য আজ এই লেখা নয় রে। যা তোদের কোনোদিন বলতে পারিনি, জানতে দিই নি তার জন্যই এই চিঠি লেখা।

তোরা দুজনেই পড়াশোনায় খুব  ভালো ছিলিস , কিন্তু খুব ফাঁকি দিতিস, আমি পাশে না বসলে কোনোদিন কেউ পড়তে চাইতিস না।  আমি সারাদিন অফিসে কাজ করে এসে ,বাড়ির কাজ করার মাঝে খুব কম সময় তোদের দিতে পারতাম। তার মাঝেই কি ভাবে যেন সময় করে আমরা আমাদের একটা ছোট্ট পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছিলাম..... তাতে  অন্য কারো প্রবেশ বর্জিত ছিল।  কেন না আমাদের বিনা কারণে খুশী হওয়ার এত অনেক কিছু আমরা সারা দিন জমিয়ে রাখতাম যা হয়তো অন্য অনেকের কাছে তুচ্ছ লাগতো। 

আমরা সিনেমা, থিয়েটার কোনোদিন যেতাম না.. একদম যেতে পারতাম না তা হয়ত নয় কিন্তু আশ্চর্য ভাবে তোরাও আমাকে কোনোদিন বিরক্ত করিস নি যাবার জন্য। আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে পয়সার প্রাচুর্য খুব কম ছিল... যা ছিল সে আমাদের মনের আনন্দের প্রাচুর্য।  আমরা ছোট খুশিতে অনেক খুশি থাকতাম তাই না রে ? তোদের হোম ওয়ার্কের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সেই রং ভরা রঙ্গিন মুহূর্ত গুলো এত দামী ছিলো যে আজও এই চিঠি লিখতে বসে আমি আশে পাশে তোদের সেই হাসির কিলকারী শুনতে পাচ্ছি।

খুশী হবার দামী সাধন আমাদের কাছে খুব কম ছিল। ছোট দু টি ঘর আমাদের সুখের নীড় ছিলো। নানান রকম পাতা বাহারী গাছে আমি তাকে সুন্দর করে সাজাতে চেয়েছিলাম। এক ফালি অন্ধকার রান্নাঘরে অফিস থেকে ফিরে রান্না করতাম গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে.... সখী ভাবনা কাহারে বলে....

কিন্তু তাতেও তোরা নিরাশ করিস নি আমায় কোনোদিন। প্রতিটি পরীক্ষায়... লেখাপড়া, আঁকা , খেলাধুলা সবেতেই তোরা এক এক করে আগে এগিয়ে যেতে লাগলি।  প্রতিবার ছোট ছোট প্রাইজ আমার হাতে তুলে দিয়ে তোরা যে আমাকে কতবার গৌরবান্বিত করেছিলি তা আমি ভুলি কি করে বল তো?

আমি তোদের অনেক চাওয়া , অনেক আশা পুরো করতে পারিনি... খুব সাধ ছিল রে কিন্তু সাধ্য একটুও ছিল না। আর কি করে যেন তোরা এটা বুঝে গেছলি। তোরাও তোদের অনেক পছন্দের জিনিষ দেখেও না দেখার ভান করে অনেকবার চলে যেতিস তাই।কিন্তু মা এর চোখ কি ফাঁকি দেওয়া যায় বল ?

উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করে খবরের কাগজে তোর নাম বেরিয়েছিল ঋষি... তার আগের দিন সারা রাত আমি ঘুমোই নি রে। ঠাকুরের কাছে  শুধু চেয়েছিলাম তোরা যেন যা যা চাস সব পেয়ে যাস।তোকে কিন্তু আমি কিছু দামী উপহার দিতে পারিনি... দুটো পেন কিনে দিয়েছিলাম বোধহয় 😢

রিয়া তুই কলেজে টপ করলি, ডাঃ আব্দুল কলাম এর হাত থেকে তোর প্রাইজ পাবার কথা ছিল.... কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো 500 টাকা। সেই convocation এর আগের দিন আর কিছুতেই আমি জোগাড় করে উঠতে পারলাম না। লজ্জায় দুদিন তোর মুখের দিকে তাকাই নি ভালো করে। জানি তুই সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলি... আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা! 

সবসময় সঙ্কুচিত হয়ে থাকতাম... আমার মনে হতো কি করলে , কি ভাবে থাকলে তোদের ভালো হতে পারে। ভগবান কে বলতাম ,সব কষ্টের বোঝা আমায় দিয়ে তোদের জীবন যেন উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে শুধু ওপরে উঠে যায়। কোনোদিন কোনোকিছুর বাধা যেন তোদের পথ চলাকে বিঘ্নিত না করে। 

ঋষি তুই আমার অনেক আদরের... একটু বেশী হয়তো। এই নিয়ে তোদের দুভাই বোনে সবসময় লড়াই হতো।  আসলে যেদিন তুই হলি তখন আমার মাত্র পঁচিশ বছর বয়স.... হসপিটালের বিছানায় শুয়ে যেই নার্স বলে উঠলো ,ছেলে হয়েছে , আমার তারুণ্যে যেন চার চাঁদ লেগে গেলো। খুব গর্ব হোলো আচ্ছা মেয়েদের দেহ থেকেই ছেলেদের সৃষ্টি!  কি যে খুশি হয়েছিলাম সেদিন জানি না। হয়তো বয়সটা অনেক কম ছিল বলে  কিংবা হয়তো অন্য কোনো কারণে ! তুই রাগিস না রিয়া। 

তুই তো আমার মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে কবে আমার মা হয়ে গেছলি আমি তা বুঝতে পারিনি একটুও। সবসময় শাসন, সবসময় খেয়াল রাখা , তোকে দেখে তোর থেকে শিখে কত জনকে বদলে যেতে দেখেছিলাম রে।

আমি অবাক হয়ে তোকে দেখতাম এক এক সময়, তুই এত গুছিয়ে কি করে কাজ করতিস,  আমি আর ঋষি   কেমন যেন তোর ওপরে পুরোপুরি সব ছেড়ে নিশ্চিন্তে থাকতাম। 

তুই নিপুণ ভাবে ঘরে বাইরে সব কিছু সামলাতিস তার সাথে আমাদের দুজনকেও তাই না রে ! এই ভাবে সুখে দুঃখে আমরা বেশ ছিলাম না রে...

ঋষি পড়াশোনায় তুই অনেক ভালো ছিলি...  তোর কাছে খুব কম বই ছিল, কলেজ থেকে ফেরার পথে রাত আট টা অবধি না খেয়ে না দেয়ে বন্ধুদের থেকে বা লাইব্রেরির বই নিয়ে কোথায় যেন কম পয়সায় জেরক্স করা যায় তুই সেখানেই যেতিস আমাকে না বলে। আমি কষ্ট পাবো বলে। কিন্তু একদিন  অনেক দেরী হওয়ায় কাঁদো কাঁদো আমাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে ফেললি অনেক প্রশ্ন করার পর। 

 সে রাতে আমি রান্না করতে করতে অনেক কাঁদলাম , ঘুমন্ত তোদের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্ন দেখলাম ... ঠাকুর যেন জিজ্ঞেস করছে,তোর কাছে দুটো রাস্তা খোলা আছে। তোর নিজের সুখ চাস না ওদের... ? আমি স্বপ্নেই বললাম আমার নিজের কিচ্ছু চাই না ঠাকুর। তুমি ওদের সব আশা পূরণ কোরো। 

সে ডাক ভগবান শুনে নিলেন। আমি একা, একাই থেকেই গেলাম। তোদের বড় করতে করতে আমি কবে যেন জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে চলে এলাম।

ঋষি তোর প্রাইজের দিনের ড্রেস  আমি কিনে দিতে পারিনি হয়তো, পুরো স্কুলে কলেজে কোনোদিন তোকে দামী কিছুই কিনে দিতে পারিনি হয়তো, হয়তো আমার জন্য তোর সিএ  পড়া হয়ে ওঠেনি.... কিন্তু আমি জানি আমি যত টা করার চেষ্টা করেছি, এর বাইরে আর হয়তো আমি  আর পারতাম না রে।

 ক্লান্ত শরীরে তোদের বড় করতে করতে কবে যেন আমার সিরদাঁড়াটাই ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে গেল। না জানিয়ে যেদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম ... উনি খুব বকেছিলেন সেদিন। বলেছিলেন ,একটু কাজ কম করুন। রেস্ট নিন মাঝে মাঝে। 

কিন্তু তা কি করে হতো বল তো ??  কি করে বিশ্রাম নেবো আমি বল তো ?? আমার যে তখনো লড়াই শেষ হয় নি। তোদের আরো যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বাকী ছিল তখন। তাই ওষুধ খেয়ে, ইঞ্জেকশন নিয়ে আবার  আমি ঠিক তো হয়েই গেছলাম। তোদের ঘুমোনোর পর পিঠে পায়ে নিজের হাত বুলোতে বুলোতে ঘুমিয়ে পড়তাম পরের দিনের যুদ্ধ লড়ব বলে। 

জানি অনেক কিছ��� পারিনি... হয়ত আরো করা উচিত ছিলো। হয়তো আরো একটু অন্য ভাবে ভাবতে পারতাম । হয়তো আরো কোনো কাজ করে তোদের মনের ছোট ছোট না পুরো হওয়া ইচ্ছে গুলোকে বাস্তবের রং দিতে পারতাম । কিন্তু ওই যে লড়াই করতে নেমে কোনোদিন পেছন ফিরে আর দেখা হয়নি রে।

তাই খারাপ ভালো ভাবার সময় হয়নি কোনোদিন। যদি পরজন্ম বলে সত্যি কিছু হয়, তাহলে আমি সে জন্মেও তোদেরই মা হতে চাই। এজন্মে যা পারলাম না , যা যা তোরা চেয়েছিলি আমি দিতে পারিনি ... আজ কথা দিলাম সে জন্মে সব দেবো। শুধু একটু সান্তনা তাও, যে আমার সর্বস্ব আমি তোদের বড় করার জন্য দিতে পেরেছি। 

সে আমার গয়না গাটি, সাধ আহ্লাদ বা আমার মা হওয়ার পরের দিনগুলো  থেকে আজ অবধি সব মুহূর্ত গুলো।

হয়তো আরো পারতাম , হয়তো আরো করা উচিত ছিল।

আমার একটু চাওয়া কে তোরা কি করে যে এত বড় করে প্রাধান্য দিলি তাতেই তো আমার সব অপূর্ণ ইচ্ছে এক নিমেষে পুরো হয়ে গেলো। আমি সবার তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের পাত্রী থেকে আবার কখন যে মাতৃ গরিমায় বিভূষিত হয়ে গেলাম , সে শুধু আমার ভগবান জানে।

তোরা না চাইতেই আমাকে অনেক অনেক কিছু দিলি। আমি যা যা হারিয়েছিলাম তোরা দুজন মিলে তা একটু একটু করে আমাকে সব কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা আজ অবধি তো করেই চলেছিস। তোদের জীবনে আমি যে কি তা তোরা যত বড় হলি তা শুধু আমি নয় , আশেপাশেরও সবাইকে তোরা বুঝিয়ে দিলি।

কিন্তু ওই যে... আমার হারিয়ে যাওয়া কিছুই আর চাই না রে আমার। গয়না গাটি, শাড়ী ,বাড়ী সব তো দিলি তোরা। এই ভেবেই ঠাকুরের পায়ে মাথা ঠুকি বারবার।  আমার সব দিয়ে তোদের বড় করতে পেরেছি আর তার মর্যাদা তোরা দিয়েছিস তাতেই মাতৃ ঋণ শোধ হয়ে গেছে বাবা। এই টুকু তেই যে মা এর মন ভরে গেছে রে।

দেবার মত আর কিছু নেই রে আমার....শুধু অনেক অনেক আশীর্বাদ রইলো।

ভালো থাকিস , মানুষের মতো মানুষ  হোস আর যত টা পারিস ,অসহায়, গরীব মানুষের পাশে দাঁড়াস। আমি আর কিছু চাই না তোদের কাছে। 

 বর্ষা ভেজা কোনো দিনে কোনো নদীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে যদি কোনো জল তরঙ্গের আওয়াজে এক মুহূর্ত থমকে যাস ,বা কোনো পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কোনো উদ্দাম ঝর্ণা কে দেখতে পাস জানবি,  আমিও আশে পাশে তোদের সাথে আছি। একবার হলেও আমাকে মনে করিস তোরা ..... আমার তো আর দেখা হোলো না! ! তোদের মনের আলোয় আমি নয় দেখে নেবো বারবার।

চোখে জল আনিস না ... আমার কষ্ট হবে। তোদের চোখে জল আমার একটুও ভালো লাগে না।  তোদের ছেড়ে যেতে আমারই কি কোনোদিন ইচ্ছে ছিল। কিন্তু যেতে যে হবেই রে সবাইকে। তাছাড়া কথা তো দিলাম পর জন্মে মা  হবার। সে জন্মে আমার সব না পারা কাজ গুলো কে সম্পূর্ণ করবো যে আমরা আবার।

সেই একটা গাছে ঘেরা সুন্দর বাড়ির দোতলায় গোল বারান্দা... তা তে রং বেরংগের ফুলের গাছ,  আস্তে ভেসে আসা রবীন্দ্র সংগীত আর আমরা সবাই ! আমরা সেই আগের মতো বিনা কারণে হাসছি... একে অপরকে জড়িয়ে !

সে জন্মের জন্যই এবার যাওয়া যে !

আমার ভালোবাসার রিয়া ঋষি

মা

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day