সোনার তরী... কে যাবি পারে...
2456
2
17
|   Jun 29, 2017
সোনার তরী... কে যাবি পারে...

আজ একটু দিনটা আলাদা। আজ আসলে এই "সোনার তরী"র জন্মদিন।  তোমরা ভাবছো "সোনার তরী"কি বা কে?? সব বলব... বলবো বলেই তো আসা এখানে। আসলে তোমাদের  না বললে  কাকে বলি বলতো??  

সোনার তরী আমাদের মতো একটু যাদের বয়স অনেকটা বেড়ে আবার কমে যাওয়ার দিকে তাদের মতন কিছু মানুষের সময় কাটানোর একটা সুন্দর জায়গা। আমরা এখানে সবাই প্রায় বেশ নবীন। সবচেয়ে যে নবীন তার বয়স প্রায় 50  ছুঁই ছুঁই। হ্যা , কিন্তু তাতে কি হয়েছে আমরা তো সবাই সারাদিন , সারারাত আনন্দের জোয়ারে ভাসছি।

 ওই যে যেদিন তুমি বুঝে যাবে তোমার আর হারানোর কিছুটি নেই.... সব এবার সাঙ্গ হবার পালা। সেদিন থেকে আর কোনো ভয়, দুঃখ থাকবে না তোমার। আমাদের সবাই প্রায় মোটামুটি ওই চাওয়া পাওয়ার জগৎ টাকে  বিদায় জানিয়ে এখানে এসে গেছি। 

এখানে সবাই প্রায় এক রকম আমরা। আমাদের কেউ কিন্তু বাড়ী ঘর ছেড়ে এখানে মনের দুঃখে আসিনি। আমাদের সকলের ছেলে মেয়েই খুব ভালো, মার্জিত, শিক্ষিত। ওরা আমাদের সবাইকেই প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। আসলে আমরা সবাই কিছু না কিছু ভাবে একজন অপরের সাথে জড়িত হয়ে গেছলাম। কখনো কোনো সাহিত্য সভায়, কোনো গানের অনুষ্ঠানে বা হয়তো কোনো  পার্কের সন্ধ্যা অনুষ্ঠানে।

 আমাদের সন্তানেরা সবাই নিজেদের জীবনে ব্যস্ত। প্রায় সবারই নাতি নাতনী বড় হয়ে গেছে বা হোস্টেলে আছে। সুতরাং আমাদের অফুরন্ত সময়। এভাবেই একে একে একজন আরেকজনের কথা শুনতে জানতে গিয়ে আমরা প্রায় জনা পনেরো কুড়ি জন একদিন এই একটা  স্বপ্ন দেখে ফেললাম। আমরা সবাই ঠিক করলাম, কেন না চেষ্টা করা যাক একটু আলাদা হয়ে বাঁচার☺। 

আবার একটু বুক ভরা নিঃশ্বাস নেওয়া যাক না .... শেষ নিঃশ্বাস নেবার আগে😊😊😊।                           বলা বাহুল্য, এ নিয়ে অনেক ঝড় উঠলো। ছেলে মেয়ে প্রায় ধমকি দিলো.... তোমরা এভাবে ছেড়ে চলে গেলে লোকে কি বলবে!! আমাদের সমাজে মুখ দেখানো দায় হবে।  আমরা কোন ভাবে কি তোমাদের দুঃখ দিয়েছি কোনোদিন ??

কিন্তু আমরা সকলে প্রায় প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম... আমরা ছলে বলে কৌশলে এ লড়াই জিতবই। তাই মান অভিমান  অনেক ঝড় , অনেক  চোখের জলের পরে কি জানি কি ভাবে একে একে সবাই রাজি হয়ে গেল।                                              

তারপর এই "সোনার তরী"তৈরী হলো। সবাই আমরা একে এত সুন্দর পরিকল্পনা দিয়ে সাজালাম... যে আমাদের ছেলে মেয়েরাও ঘুরতে এসে অবাক হয়ে গেলো।  এতদিনের আটপৌরে বাবা মা কি ভাবে এই অসাধারণ হয়ে উঠলো তা ওরা বোঝার চেষ্টা করেও হার  মেনে নিলো।

ওরা  এখন দল বেঁধে মাঝে মাঝেই আসে। আমাদেরও যার যখন মন হয় বাড়ি ঘুরে আসি, কিন্তু তারপরেই প্রাণ ছট পট করলেই আবার এমুখো হয়ে যাওয়া। বাড়িতেও সবাই বুঝে গেছে এরা আর কোনো বন্ধনে জড়াতে রাজি নয়। তাই আর রাগারাগি, মান অভিমান কিছুই নেই।                                                                      আসলে এত গুলো মানুষ অকেজো হয়ে যেতে বসেছিলো। বাড়ীতে প্রায় সবারই কাজের লোক কাজ করে দেয়। সারাদিন টিভি দেখে, পেপার পড়ে আর সময় কাটতো না আমাদের কারুরই। তাই যখন, যেদিন সবাই মিলে এই প্ল্যান টা করেছিলাম সেদিন রাজ্য জয়ের খুশীতে সারা রাত আমরা কেউ দুচোখের পাতা এক করিনি। 

এই সোনার তরী তাই আমাদের স্বপ্নের একটা ঘর... যার চৌখাট পেরোলেই একটা অপার ভালোলাগায় মনটা তোমার ভরে যাবে। কোথায় টবে নানান রঙ্গিন ফুলের গাছ রাখা... তার পাশে দুটো বেতের চেয়ার রাখা। এক ক���নে হারমোনিয়াম, তবলাও আছে। বারান্দার পাশে অনেক বই আর ম্যাগাজিনে ভরা সুন্দর করে সাজানো আলমারী।

 সবাই নিজের মতো করে বাঁচে এখানে। কোনো সময় বাঁধা নেই কিছুরই জন্য। কে ঠাকুর পুজো করবে , কে করবে না কেউ মাথা ঘামায় না সে সব নিয়ে। এ যেন এক সব পেয়েছির দেশ.... ।  প্রানের গোপন কুঠুরিতে রাখা না পুরো হওয়া সেই স্বপ্ন, সেই একটু কোথাও জমে থাকা অভিমান... সব যেন পুরো করার একটা আশ্বাস এখানের বাতাসে বাতাসে ভেসে আছে।

এই যেমন আজ... কাউকে কিছু আলাদা করে নির্দেশ দেওয়া হয়নি কিন্তু সবাই সবার  কাজটা কেমন ভাবে যেন বুঝে গেছে। সবাই ব্যস্ত... সবাই হাসছে ,দৌড়োচ্ছে আবার মাঝে মাঝে এক দু কলি গানও গেয়ে উঠছে।ছন্দা দি অন্য দিন এসময়ে চুপচাপ খবরের কাগজের পাতা  ওল্টাতে ওল্টাতে চা খায়,আজ কিন্তু কোন সকালে উঠে আল্পনা দিয়ে ফেলেছে পুরো হল ঘরটা জুড়ে। আমি আর রীমা প্রায় সব কিছুরই দায়িত্ব নিজেদের ওপর রেখেছি। কারো যাতে কোনো কষ্ট না হয় ,সে টাও দেখা আমাদের কাজ। আসলে জীবনের এই শেষ অধ্যায়ে এসে আমরা সবাই কেমন যেন মুক্ত, বাঁধন হীন হয়ে  গেছি।

তাও মনে হয় , যদি কারো একটু  মনের একাকীত্ব দূর করতে পারি... একটু পাশে থেকে আর অনেকটা হৈ হৈ করে ! 

জীবনের তরী বেয়ে এসে আজ নদীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই... কেউ উদাস থাকি না আমরা কখনোই। জানি যে একদিন এই খেয়া বাওয়া শেষ হয়ে যাবে। চলে যাবো আমরা কোথায় কে জানে ! 

সব চেনা , প্রাণের প্রিয় সব ছেড়ে যেতেই যে হবে একদিন। মুঠো শক্ত করে ধরে রাখা এই সোনার তরী টাও ছেড়ে। 

স্নিগ্ধা ডি গান গাইলো , রবি দা  খুব ভালই মাউথ অর্গান শোনালো। আমি আর রীমা সবাইকে নিয়ে কেক কাটলাম। খুব ভালো কাটলো আজকের দিনটা।

রাতে বাগানে রোজকার মতো আড্ডা বসলো। কি জানি কেন সবাই বড় বেশি চুপচাপ। আমার একটুও ভালো লাগে না যে। আমি বলে উঠলাম... কি হয়েছে তোমাদের?? কেনই বা এত শান্ত তোমরা... 

কোনো জবাব দিলো না কেউ। সবার চোখে কি জানি কেন জল চিক চিক করছে মনে হোলো। শুধু রীমা বলে উঠল আমার হাত ধরে.... আচ্ছা , সত্যি করে বল তো ... আমরা সবাই একদিন চলে যাবো ?? কোথায় যায় রে সবাই ? আর কোনোদিন কখনো ফেরা যায় না রে !

আমিই কি ছাই এর একটাও উত্তর জানি... রীমা কে বলি কি করে যে গত দশ বছর এই ভেবে ভেবেই আমিও তো কত রাত ঘুমোই নি। যেতে কি আর আমারো একটু ইচ্ছে করে ! কিন্তু ওই যে জগতের না কি নিয়ম.... তাই একদিন এই সোনার তরী ছেড়ে আমিও....😢😢

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day