একটা সত্যিকারের গল্প
818
1
|   Jun 23, 2017
একটা সত্যিকারের গল্প

 সত্যি একটা গল্প

 

সংহিতা ঃ -  মালাই , তুমি একা একা বারান্দায় কি করছ ? ঘরে চলে এসো ।

মালাই ঃ- মাম্মা আমি কিছু করছি না , চুপ করে দাঁড়িয়ে আম্মু (ঠাকুরমা) দের বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছি । আম্মু বারান্দায় এলে আম্মুকে happy birthday বলবো । তুমি যে কাল পাপাকে বললে আজ আম্মুর জন্মদিন……!

সংহিতা ( মৃদু হেসে ) ঃ - তুমি ফোন করে আম্মুকে  বারান্দায় আসতে বল , তাহলে দেখাও হয়ে যাবে , কথাও হয়ে যাবে ।

                                                            ************

                   ছোট্ট মেয়ে মালাই , সবে Prep – II ‘ তে পড়ে , অবশ্য ওর কার্যকলাপ দেখলে বা কথা শুনলে বোঝা যায় ও কত পরিণত , কত  বাড়তি  অভিজ্ঞতার ভারে ভারাক্রান্ত ওর গোটা বাল্য । একমাত্র মেয়ে , পাপা-মাম্মা’র কাছে প্রাণাধিক প্রিয় ,তবুও যেন কত কিছু না পাওয়ার কষ্ট , কত কিছু পাওয়ার ইচ্ছা  ওর চোখে । স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির গল্প করার সময় , নিজের পাওনা গণ্ডার হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারে না মালাই । আবার এতটাও বড় হয়নি যে , প্রথম থেকে অঙ্কটা কষে হিসাব মিলিয়ে দিতে পারে । অগত্যা পরিস্থিতির সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয় । মালাইএর কথা বার্তা বলার ধারণ , চাল-চলন ওর বয়সি বাচ্ছাদের তুলনায় অনেকটাই আলাদা ; একটু বেশীই পরিনত । আসলে ওর বাল্য ,  কখন যেন,  কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে প্রাপ্ত বয়সের দিকে এক পা এগিয়ে গেছে।

                   মালাই এর  সবসময়ের সঙ্গী ওর মাম্মা । দু’জন – দু’জনকে ঘিরেই থাকে , দু’জন – দু’জনকে নিয়েই বাচে । আর পাপার প্রান-ভ্রমরাটি যেন সে স্বয়ং ।তবে কোন এক অজ্ঞাত কারণে  , জন্মগত ভাবেই মালাই দাদু-আম্মুর ভালবাসা থেকে বঞ্ছিত। মালাই ওর দাদু-আম্মুকে খুবই  miss করে । কোনও কিছুর বিনিময়ে’ই দাদু-আম্মুর ভালোবাসা যেন পুরণ হওয়ার নয়।

                   বছর চারেক আগেও , মালাই পাপা-মাম্মা , দাদু-আম্মু , পিপি আর পোষা  কুকুর এর সঙ্গে এক’ই বাড়িতে থাকত । পাপা Professor, খুব’ই ব্যাস্ত । মাম্মা school teacher । পাপা-মাম্মা বেড়িয়ে গেলে ও বাড়ির আন্যান্যদের সঙ্গে’ই থাকতো আর ওর দেখভাল করার জন্য রাখা হয় একজন আয়ামাসিকে ।মালাই এর মা , সংহিতা , আয়ামাসি’কে সব দিক থেকেই খুব যত্নে রাখে , কারণ সংহিতা জানে  যে , তার অনুপস্থিতি’তে সেই আয়ামাসি’ই মালাই’এর দেখাশোনা করবে। শ্বশুর-শ্বাশুরি-ননদকে এই ব্যাপারে একটুও ভরসা করে না সংহিতা । তাছারা , ওদের সঙ্গে প্রথম থেকেই সংহিতার একটু আকচা – আঁকছির সম্পর্ক । কারণ , ওদের  সবসময়’ই সংহিতার স্বামী সুগত’কে হাতে রাখার একটা প্রবণতা আছে , ওরা সবসময় সুগতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে এ রাখতে চায় । ওরা চায় , সুগতর টাকাপয়সা , চাওয়া – পাওয়া , এমনকি স্বামী – স্ত্রীর মধ্যেকার অত্যন্ত ব্যাক্তিগত সম্পর্ক –সবই ওদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে ।এই অন্যায় দাবি সংহিতার মত একজন বাস্তববাদী , যুক্তিবাদী , ন্যায়বাদী ও স্বাধীনচেতা মেয়ের পক্ষে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়া  বেশীদিন সম্ভব ছিল না । আর প্রতিবাদের ফল গৃহযুদ্ধ ।

                   কথায় বলে ,আসলের থেকে সুদ বেশী প্রিয় হয় মানুষের কাছে । তবে এই  একরত্তি মেয়ে মালাই এর জীবনে এটি একটি বিতর্কিত সত্য ।কারন , মালাই কোনদিনই ওর আম্মু-দাদু বা পিপি’র কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি । ওদের কাছে মালাই –এর অস্থিত্ব  ঠিক একজন পাশের বাড়ির বাচ্ছার মতই বরং বলা যায় তাও নয় । ওদের কাছে মালাই এর থেকে  অনেক বেশি প্রিয় ওদের পোষা কুকুর পলি ।  মালাই জন্মানোর পর থেকেই ওরা নানান রকম ষড়যন্ত্র করা শুরু করে , বিভিন্ন ভাবে সংহিতার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। যেমন ---ছোট্ট মালাই আর সংহিতাকে  একটা ফ্ল্যাটে প্রায় বন্দি আবস্থায় রেখে দেয় , সুগতকে ভুল বুঝিয়ে সংহিতার সঙ্গে দুরত্ব তৈরি করতে বাধ্য করে , দিনের পর দিন সুগতকে মালাইএর কাছেই যেতে দেয়নি , এমনকি শারীরিক ভাবে অসুস্থ সদ্য মা হওয়া সংহিতাকে ঠিক ভাবে খেতে পর্যন্ত দিত না , রুগীর পথ্য বলে দিনের পর দিন এমন অখাদ্য  খেতে দিত যা কোন মানুষের পক্ষে গলাধঃকরণ করা সম্ভব নয় । প্রবল মানসিক চাপ আর অপুষ্টির ফলে সংহিতার শরীরে দুধ উৎপাদনের মাত্রাও কমে যায়  - যার পরোক্ষ প্রভাব প্রত্যক্ষ ভাবে পরে সদ্যোজাত বাচ্চাটির ওপর । খিদের জ্বালায় ছটফট করত মালাই , চিৎকার করে কাঁদত । সেকথা মনে পরলে আজও চোখ ছলছল করে ওঠে সংহিতার । তখন সংহিতা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে এতোটাই দুর্বল ছিল যে ছোট্ট মেয়েটার কান্না শুনে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই তার করার ছিলনা । সংহিতার মা নিতা , মেয়ের হয়ে প্রতিবাদ করায় বা মেয়েকে নিজের  কাছে নিয়ে যেতে চাওয়ায় তাকেও বহুবার অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে  হয় ।

                   তবে কি কারণে  রিতা – মিষ্টি – অমিত এই সব করছিল…? শুধু কি সংহিতাকে জব্দ করার জন্য , নাকি অন্য কোন কারণ আছে ? হ্যাঁ, সংহিতাকে জব্দ করা ছারাও আর বেশ কিছু কারণ আছে । ওদের মনে হয়েছে , মালাই এর সঙ্গে সুগতর attachment গড়ে উঠলেই , সুগত বুঝি ওদের নিয়ন্ত্রনে থাকবে না , সুগত বুঝি আর ওদের বাধ্য ছেলেটি থাকবেনা , সুগত বুঝি  আর ওদের অঙ্গুলি হেলনে ওঠা- বসা করবে না , ওদের প্রাণাধিক প্রিয় পোষা কুকুর পলি-কে বুঝি আর আদর করবে না , তাছাড়া সবথেকে বড় কথা হল , সুগতর সন্তানের মা হিসাবে, সুগতর ওপরে সংহিতার অধিকার আরও কয়েক গুন বেড়ে যাবে । আর সেই কারনেই এতো ষড়যন্ত্র , এতো অত্যাচার , এতকিছু………। কি অদ্ভুত না…! কথায় আছে – ‘’ blood is thicker than water ‘’ , কিন্তু সুগতর একান্ত আপনজন হয়েও ওরা কখনই সুগতর ভাল লাগা বা ভাল থাকার কথাটা ভাবেনি , বরং নিজেদের না ভাল থাকার আশঙ্কায় একের পর এক  খারাপ কাজ করেছে, অন্যায় করেছে , এবং জীবনে ভাল থাকার মুহূর্তগুলোকে গলা টিপে হত্যা করেছে ।

                   দিনের পর দিন সংহিতার ওপর অত্যাচারের মাত্রা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে , তবে সেই অত্যাচার কিন্তু আর পাঁচটা শ্বাশুরি-বউমার চুলোচুলির মত নয় । তার থেকে ভীষণভাবে আলাদা । খানিকটা পেছন থেকে ছুরি মারার মত ব্যাপার । যাকে ছুরিটা মারা হল,  সে বুঝতে পারল কে ছুরিটা মেরেছে কিন্তু চাক্ষুষ দেখতে পেলনা । রিতা প্রায়শই , সংহিতার খাবার হয় ফেলে দিত, নাহয় খাবারে নিজের মাথার দুএকটা চুল ফেলে রাখত , যাতে সংহিতা খাবারটা খেতে না পারে । ওই কোঁকড়ানো চুল সংহিতার ভালই চেনা কিন্তু প্রমান করার কোন উপায় নেই ।আর ব্যাপারটা যে কাকতালীয় নয় সেটাও সংহিতার ভাল করেই জানা , নাহলে সব সময় বেছে বেছে সংহিতার খাবারেই কেন চুল থাকে আর তো কারও খাবারে চুল থাকে না …! এছাড়া , মালাইএর খাবার কুকুরকে খাইয়ে দেওয়া , ইচ্ছাকৃত ভাবে কুকুরকে রান্নাঘরে মল-মুত্র ত্যাগ করানো , সুগতর কানে কুমন্ত্রনা দিয়ে সংহিতার সঙ্গে ফাটাফাটি অশান্তি বাধিয়ে দেওয়া তো আছেই , এমনকি আয়ামাসিকেও সংহিতার বিরুদ্ধে উস্কে দিতেও ছারেনি রিতারা , আরও  আনেক কিছু.........।

                   বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে , ‘’চোরের দশদিন  - গৃহস্থের একদিন “ এই কথাটাই একদিন বাস্তবায়িত হল এই বাড়িতে ,  যেদিন অত্যাচারের মাত্রা সমস্ত সীমা ছারিয়ে গেছে , যেদিন শ্বশুর – শ্বাশুরি – ননদ এর ত্রি শক্তি জোট সংহিতার বিরুদ্ধে গরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাকে ধরাশায়ী করার চেষ্টায় উন্মত্ত , ঠিক সেই দিন সংহিতার হাতে আসে এক ব্রহ্মাস্ত্র ......!

                     বেশ কিছুদিন ধরেই সংহিতা লক্ষ্য করতে থাকে যে মালাই এর আয়া মুন্নি মাঝে মাঝে রিতা – মিষ্টির সঙ্গে কি যেন ফিসফিস করে বলে , আর সংহিতাকে দেখেই চুপ করে যায় । সংহিতার একটু  সন্দেহ হয় ।আবার , যে যে কথাগুলো সংহিতা, রিতা-মিষ্টিদের জানাতে চায়না সেই কথাগুল ওরা ঠিক জেনে ফেলে ......কিন্তু কিভাবে......? যেমন – সংহিতা , নিজের টাকা দিয়ে , নিজের জন্য বা মা- বোনের জন্য কিছু কিনলে , সেকথা রিতা – মিষ্টিদের জানাতে চায়না , কারন জানতে পারলেই  রিতা সেইদিনই মিষ্টির জন্য কিছু একটা কিনতে হবে বলে সুগতর কাছ থেকে টাকা আদায় করেই ছাড়বে , আর পুরো সংসারের জোয়াল যেহেতু সুগতর কাঁধে ,তাই সে এই বাড়তি খরচের বোঝা মোটেই বহন করতে চায়না । ব্যাস ! যেই মাত্র সুগত ওই বাড়তি টাকা দিতে অস্বীকার করল অমনি মায়েতে – ছেলেতে বেধে গেল ঝগড়া । তারপর একে একে মায়ের পক্ষে যোগ  দেয় অমিত আর মিষ্টি  । আর এই বিষম যুদ্ধে যে সুগতর হার নিশ্চিত তা তো বলাই বাহুল্য । শেষ – মেশ এই যুদ্ধে যে পক্ষই হারুক বা জিতুক না কেন , এই যুদ্ধের সমস্ত দায় এসে পরে সংহিতার ঘাড়ে । উপসংহার এটাই দাড়ায় যে সংহিতা যদি নিজের জন্য বা মা – বোনের জন্য কিছু না কিনত তবে এই আশান্তি মোটেই হত না । সুতরাং সংহিতাই আসল দোষী ।

                   এছাড়াও , সুগত – সংহিতা এক সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেলে , রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে গেলে , বা সংহিতার মায়ের কাছে গেলে – সবেতেই ওদের অসুবিধা…। তাই আজকাল ওদের না জানিয়েই এই সব জায়গায় যায় সংহিতারা । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল , সংহিতাদের এই তথাকথিত secret গুলো কিভাবে যেন ওরা জেনে ফেলে , এবং তা নিয়ে বেধে যায় ধুন্ধুমার অশান্তি । কিন্তু কিভাবে……? সুগত – সংহিতা ছাড়া ওদের secret গুলো একমাত্র মুন্নি’ই  জানে । সংহিতার সন্দেহ আর একটু প্রবল হয় । তবে কি ত্রিশক্তি জোট এখন চতুর শক্তি জোটে পরিণত হয়েছে...?

                   সংহিতার সন্দেহ প্রবলতম হয় , সেদিন , যখন মালাই একটু দুষ্টুমি করেছিল বলে রিতা মালাইকে বলেছিল – ‘’দাড়াও মুন্নি আসুক , তোমার ব্যাবস্থা ও’ই করবে । ‘’ কথাটা কানের পর্দাকে স্পর্শ করা মাত্র সংহিতার দীর্ঘ – নিঃশ্বাস যেন মাটিতে আছড়ে পড়ে । মায়ের মন যেন নিঃশব্দে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে । ‘’ তবে কি মুন্নি , মালাইকে প্রচণ্ড ভয় দেখায় ? ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয় ?  .........’’ না জানে আরও কত কিছু সহ্য করতে হয় ওই আড়াই বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে , - ভেবেই সংহিতার চোখের কনা ভিজে ওঠে , মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে , যে সত্যই যদি এমন কিছু ঘটে থাকে তবে সে আর চাকরি করবে না , মেয়ের কাছেই সারাদিন থাকবে । একটা secured সরকারি চাকরির থেকে মালাইএর জীবনের মুল্য অনেক বেশি ।

                   সংহিতা খুব ভাল করেই জানে যে ,  তার সন্দেহের কথা সুগত কে জানিয়ে কোন লাভ নেই ।বরং সুগতকে জানানো মানেই , আসল সমস্যার সমাধান হোক বা না হোক , তাদের মধ্যেকার অশান্তি যে কয়েক গুন বেড়ে যাবে সে ব্যাপেরে কোনও সন্দেহ নেই । তাই সংহিতা ভাবতে থাকে , দিন – রাত ভাবতে থাকে , কি ভাবে আসল সত্যিটা জানা যায় ……কিভাবে আসল ষড়যন্ত্রটা হাতে  - নাতে ধরে ফেলা যায় ……কি ভাবে প্রমান করে দেওয়া  যায় , মিথ্যে , সব মিথ্যে ……কিভাবে সুগতর চোখের ঠুলিটা টান মেরে খুলে ফেলা যায়……কিভাবে   এই খারাপ সব কিছু থেকে  মালাইকে বাঁচানো যায়……?

                   অনেক চিন্তা – ভাবনা করে শেষ – মেশ  সংহিতার মাথায় একটা  idea কিলবিল করে ওঠে । যদিও , সেটা কতটা ফলপ্রসূ হবে সে ব্যাপেরে মোটেই খুব একটা আশাবাদী নয় সংহিতা । তবুও , এছাড়া তো কোনও উপায়ও নেই । তাই , এই idea’টাকে ফলপ্রসু করার একটা চেষ্টা অন্তত সংহিতা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়  ……।

                   পরের দিন , সকাল থেকেই সংহিতা কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে।ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড excited , মনে হচ্ছে কোন secret mission এ যাচ্ছে , কোন  ভয়ঙ্কর string operation করতে চলেছে সে , জেটা সম্মন্ধে আর কেউ কিচ্ছু জানেনা । ……সকাল ১০’টা বাজে । সংহিতা সুগতকে বলে “ আমি ব্যাঙ্কে যাবো , একটু কাজ আছে । তুমি institute এ যাওয়ার পথে আমাকে drop করে দিতে পারবে please ? “ সুগত রাজি হয় । তবে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে সমস্ত ব্যাবস্থা ঠিক ঠাক করে যেতে হবে সংহিতাকে , একটু ভুল হলেই , সর্বনাশ । ধরা পড়লে এই যুদ্ধে সংহিতা কয়েকশ ধাপ তো পিছিয়ে যাবেই , এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চিরকালের মত বহিষ্কৃতও হয়ে যেতে পারে । আর যদি সমস্ত সত্য প্রমাণিত হয় , সমস্ত উদ্বেজনের ( suspense  ) অবসান হয় , যদি মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষগুলোর আসল চেহারাটা সবার সামনে প্রকাশ করে দেওয়া যায় , তাহলেই – কেল্লাফতে ……!

                   ঠিক সকাল ১০’টা ২৫ । সংহিতা  I-pad - এ recording button’   টা on করে , I – pad টা সোফার ওপরে অত্যন্ত  casually রেখে দেয় , তারপর ঠিক সাড়ে -১০ টায় সুগতর সঙ্গে বেড়িয়ে যায় । যাওয়ার সময় মুন্নিকে বলে যায় – ‘’ মুন্নিদি মালাইএর খেয়াল রাখিস , আমি ঘণ্টা – দেড়েক পর ফিরবো  ।‘’ঐ দেড় ঘণ্টা বোধ হয় সংহিতার জীবনের সবথেকে কঠিন সময় । শুধু মনে হচ্ছে , যদি ধরা পরে যায়......কি হবে......? কি বলবে......? তবে  যা ‘ ই ঘটুক না কেন , আত্মরক্ষায় সংহিতা কিছু একটা বলতে পারবে – এই আত্মবিশ্বাস সংহিতার আছে ।  ব্যাঙ্কের কাজ সেরে ১২ ‘টা নাগাদ সংহিতা ফিরে আসে । ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মালাই ছুটে এসে , তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে । সংহিতা মেয়েকে কোলে তুলে নেয় । নরম গালে চুমু খেয়ে বলে – ‘’কি হয়েছে সোনা , এইতো আমি এসে গেছি , আর তোমায় ছেড়ে কখনও যাবনা ।‘’ মালাই মায়ের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে । আরও কিছুখন মায়ের আদর খায় , তারপর স্বাভাবিক হয় । পুতুল্গুলোকে নিয়ে মা-মা খেলা খেলতে থাকে । সংহিতা মুন্নিকে বলে , ‘’মালাই এর গালটা লাল-লাল মনে হচ্ছে......” মুন্নি বলে , ‘’ ও  ,তেমন কিছু না , খেলতে গিয়ে একটু লেগে গেছে ।‘’ সংহিতা সেকথা’ই বিশ্বাস করে । পরক্ষনেই চোখ যায় I-pad টার দিকে । সংহিতা লক্ষ্য করে , ঠিক যেভাবে ওটাকে রেখে গিয়েছিল , ঠিক সেভাবেই রাখা আছে । এদিক-ওদিক দেখে , সংহিতা I-pad টা হাতে তুলে নেয় । Recording timer – এ দেখাচ্ছে  ১ ঘণ্টা , ৪২ মিনিট , ১৫ সেকেন্ড । সংহিতা recording টা off করে রেখে দেয় । বড় একটা স্বস্তির  নিঃশ্বাস ফেলে , - যাক বাবা…!  এ যাত্রায় সে বেচে গেছে । ধরা পরে যায়নি । Recording এ কি শোনা যাবে , কি তথ্য পাওয়া যাবে , এসব নিয়ে সংহিতা আপাতত চিন্তিত নয় । বরং সে এটা ভেবে নিশ্চিন্ত যে , সে আজ ধরা পরে যায়নি ।

                   দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে , মালাইকে ঘুম পাড়ানোর পর  , সংহিতা  recording টা শুনবে বলে , কানে  headphone লাগিয়ে , আধশোয়া হয়ে ,পিঠে বালিশ দিয়ে , তাতে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে । সংহিতার মনটা এখন খুব ভাল আছে , কারণ সে ধরা পরে যায়নি । কি যে একটা চাপা আনন্দ হচ্ছে ………।সংহিতা,  recording টা  play ক’রে ( চালিয়ে ) প্রথমেই নিজের গলা শুনতে পায় – ‘’  মুন্নিদি , মালাইএর খেয়াল রাখিস , আমি ঘণ্টা দেড়েক পর ফিরব ।‘’ তারপর কিছুক্ষণ কুকুরের চিৎকার , যেমনটা পলি সব সময়ই করে থাকে , কেউ বাড়িতে এলে বা বাড়ি থেকে বেরোলে । আরও পাঁচ মিনিট শুধু মালাইএর কথা……। আচমকা রিতার কণ্ঠস্বর , ‘’মুন্নি , সকালে সংহিতা তোমাকে  কি বলছিল গো ?” একে একে অমিত আর মিষ্টির গলাও পাওয়া যায় । রীতি���ত গোলটেবিল বৈঠক । সেই গোল টেবিল আসলে একটা postmortem  টেবিল । এখানে সুগত – সংহিতা শুধুমাত্র ,  কাটা – ছেড়া করার বস্তু । পুঁজ – রক্ত , দুর্গন্ধে মাখা-মাখি দুটো অস্থিত্ব । যেন দুটো বেওয়ারিশ লাশ । এদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করা যায় । এদের প্রতি ঘৃণায় থুতু ফেলা যায় , বমিও করা যায় । কেউ কিচ্ছু বলবে না । হিসাব মতো এমনটাই তো হওয়ার কথা । কিন্তু আজ আর এমনটা হলনা । আজ ঠিক সেটাই হল ,  যেটা চতুর শক্তি জোটের কল্পনাতেও আসেনি……।

                   Recording টা খুবই পরিস্কার । কানে headphone লাগিয়ে সংহিতা যেন আরও পরিস্কার ভাবে সবার সব কথা শুনতে পাচ্ছে । অশ্রাব্য ভাষায় সুগত- সংহিতার প্রতি গালাগালি বর্ষণ করে চলেছে – তিনজন তথাকথিত শিক্ষিত এবং একজন কার্যকরী ভাবেই অশিক্ষিত মানুষের একটি দল ।এমনকি তারা রেয়াদ করেনি ছোট্ট মালাইকেও । বাচ্ছা মানুষ , আর কতখন’ই বা গোল টেবিলের এক পাশে বসে , ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে , এর মুখ – ওর মুখ দেখতে পারে……?  কাহাতক আর চুপ করে বসে , না বুঝতে পারা কথাগুলো শুনতে পারে ……? মুন্নির কড়া নির্দেশ , তাদের অতি – জরুরি আলোচনার মধ্যে একটি কথাও বলা চলবে না । কিন্তু ওই ছোট্ট মেয়েটা , আর কতখন’ই বা কোন ঘুম পাড়ানি গান না গেয়ে , কোলের পুতুলকে ঘুম পাড়াতে পারে……? তবুও যে মুহূর্তে মালাই একটু চঞ্চল ওঠে , অমনি ওর তুলোর মত নরম দুটো গালে , গালাগালি সহযোগে ঠাস ঠাস করে চড় মাড়ে মুন্নি । কেঁদে ওঠে মালাই ।

ঠাকুমা ( রিতা )  বলেন – ‘’ ঠিক হয়েছে , তোমার মার খেয়ে মরা’ই উচিত । “

 দাদু  ( অমিত ) বলেন – “ ঠিক বলেছ “ ।

 মিষ্টি বলে – “ এত জোরে মেরো না , মা কে বোলে দেবে কিন্তু “।

 মুন্নি বলে – “ মাকে বললে আর মারবো “ ।

ভয়ে সিটিয়ে থাকে মালাই । সেদিন ছোট্ট মালাই এর একমাত্র সমব্যাথি ছিল বাড়ির পোষা কুকুরটি । মালাই এর কান্নার শব্দ শুনেই , পাশের ঘর থেকে ছুটে আসে পলি । চিৎকার করে যেন বলতে চায় – “ তোমরা মালাইকে অন্তত কিছু বোলো না , ও তো ছোট্ট একটা নিষ্পাপ শিশু , কিছুই  বোঝে না , ওকে ছেড়ে দাও ‘’। পলিকে চিৎকার করতে দেখে মিষ্টি ছুটে এসে ওকে কোলে তুলে নেয় , ঠিক যেমন নিজের গর্ভজাত সন্তানকে কাঁদতে দেখলে , মা করে থাকে । মিষ্টির সমস্ত অস্থিত্ব থেকে পলির প্রতি যেন বাৎসল্য ঝরে পড়ে । মিষ্টি , ওদের পরম আদরের পলির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলে – “ কি হয়েছে মা তোমার ? চিৎকার করতে নেই…… তোমার কাশি হবে , বমি হবে । চুপ করো মা , চুপ করো ।“ মিষ্টি চুমু খায় পলির শক্ত দুটো গালে । সহসা পলি শান্ত হয় । ওদিকে , পলিকে দেখে মালাইএর কান্নাও থেমে যায় । শুধু দু’গাল বেয়ে জলের ফোটা গড়িয়ে পড়তে থাকে । মুন্নির কড়া হাতের থাপ্পড়ে খুব ব্যাথা লেগেছে তো …।

                   সংহিতা দুঃস্বপ্নে এই ঘটনার আভাস অনেক বারই পেয়েছে  কিন্তু সেই স্বপ্ন যে একদিন বাস্তাব হয়ে যাবে , সেটা ভাবতে পারেনি । সংহিতা recording টা শুনে মনে মনে ভাবে , “ সেই জন্যই আজ ব্যাঙ্ক থেকে বাড়ি ফিরে দেখেছি , মালাই এর গালটা লাল লাল দেখাচ্ছিল , আর একই কারনে মালাই আমার গলা শক্ত করে ধরে কাদছিল । বেচারি ভয় পেয়ে কিছু বলতেও পারেনি ।“ ভয়ে , যন্ত্রণায় , রাগে , কষ্টে সংহিতার চোখ থেকে দু’ ফোটা জল গাল বেয়ে বুকের ওপর পড়ে । সেই জলে সংহিতার বুকের আগুন একটুও নেভেনা , বরং আরও দাউ দাউ করে জলে ওঠে । ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে সংহিতা । নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় তার । মায়ের পাশে , পরম প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট মালাইএর মাথায় হাত বোলায় সংহিতা আর মনে মনে বলে – “ নাজানি আর কত মার খেয়েছে মেয়েটা , কতই না কষ্ট পেয়েছে………হায় ভগবান……! “

Recording টা সম্পূর্ণ শোনার পর , প্রথমেই সংহিতা  I-pad এ  save  হয়ে থাকা  recording  file টা আরও দু’ টো  pen-drive ও একটা  CD তে  copy করে রাখে । যদি কোনও ভাবে  file টা  delete হয়ে যায় বা  VIRUS affected হয়ে যায় ……সেই আশঙ্কায় । সংহিতা জানে যে এই মোক্ষম অস্ত্রটা কোন ভাবে  হাতছাড়া হয়ে গেলে , সুগত মোটেই তার মুখের কথায় বিশ্বাস করবেনা । এর আগেও কয়েক বার শ্বশুর , শ্বাশুরি , ননদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সুগতকে বলতে গিয়ে , বেজায় ফেসাদে পরেছে সংহিতা । সুগত তীব্র অপমান করেছে সংহিতাকে । ও সব সময়ই নিজের বাবা , মা , বোনের দলেই থেকেছে , সে তারা যা’ই করুক না কেন । তাই আজ এই অকাট্য প্রমানটি কোনও ভাবেই খোয়াতে চায়নি সংহিতা ।

                   বিকেল ৪’টে নাগাদ , সংহিতা , নিজের মা’কে ফোন করে বলে – “ মা , আজ সন্ধ্যে ৭’ টায়  আমার এখানে আসতে পারবে …? দরকার আছে ।“ নিতা জানায় , - “ হ্যাঁ আসতে পারব । “ এরপর , সংহিতা ফোন করে সুগতকে বলে , “ আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে পারবে ? আমার মা তোমার সাথে দেখা করতে আসছে , কি যেন দরকার আছে বলছিল “। সুগত প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বলে – ‘’ ঠিক আছে , চলে আসবো ।“ সংহিতা যখন ফোন গুলো করছে , মুন্নি তখন ঘরেই রয়েছে ।বেশ মন দিয়ে কথাবার্তা গুলো শুনে বোঝার চেষ্টা করছে । তবে কিছুই বুঝতে পারেনি । বুঝুক বা না’ই বুঝুক , তাকে তো  শোনা কথাগুলো রিতাকে বলতেই হবে । তাই মুন্নি সুযোগ বুঝেই রিতাকে ফোন কলগুলোর ব্যাপারে জানিয়ে দেয় , ‘’ সংহিতা নিতাকে আর সুগতকে ফোন করে ডেকে পাঠাচ্ছে  সন্ধ্যা ৭’ টায় ……কি ব্যাপার …? কিছু একটা হয়েছে……! কিন্তু কি হয়েছে  বা হতে চলেছে  , বুঝতে না পেরে রিতা ফোন করে সুগতকে । কিন্তু সুগতও কোন সদ্দুত্তর দিতে পারেনি কারণ সে তো নিজেও কিছু জানেনা ……।

                   সংহিতার যেন আর তর সইছেনা । এই রকম একটা উত্তেজনাপূর্ণ কথা , কাউকে না জানিয়ে , এতক্ষণ চেপে রাখা , এক জন মেয়ের পক্ষে যথেষ্ট বড় ব্যাপার । ঠিক পৌনে সাতটায় সংহিতার মা ���িতা আসে , তারপর সাততা দশ এ আসে সুগত । সুগতর সমস্ত অস্থিত্বে যেন বিরক্তির ছাপ । নিতাকে জিজ্ঞেস করে , - “ হ্যাঁ , মা বলুন কি বলবেন বলে আমাকে ডেকেছেন ?” নিতা একটু অবাক হয়ে বলে , “ আমি …?” সংহিতা ব্যাপারটা সামলে নিয়ে সুগতকে বলে , “ তুমি আর মা , drawing room  এ বস , একটু দরকার আছে । সংহিতার উদ্দীপনা তখন চরমে , হৃদ স্পন্দনের হার বোধ হয় প্রতি মিনিটে ১৮০ ছারিয়ে গেছে । মনের মধ্যে রাগ , ভয় , আনন্দ , ক্ষোভ , অভিমান , অপমান , সব মিলে মিশে একাকার । আর মুখে হাসি – কান্নার এক মিলিত অভিব্যাক্তি ।

                   ফ্ল্যাটের drawing room টার সঙ্গে আন্যান্য তিনটে ঘরের যোগাযোগ খুবই ভালো । drawing room এ কিছু ঘটলে , তা তিনটে ঘর থেকেই পরিষ্কার ভাবে – শোনা , দেখা , আর বোঝা যায় এবং উল্টোটাও ( and the vice versa ) । সুগত আর নিতাকে  drawing room এ বসিয়ে , সংহিতা recording টা play করে ।  বলে – ‘’ ভাল করে মন দিয়ে শোনো “ । প্রথম পাঁচ – দশ মিনিট পর থেকেই বিস্ফোরণ শুরু হয় । একের পর এক বিস্ফোরণ । বিস্ফোরণের জেরে চতুর-শক্তি জোট তখন অস্থিত্বের সংকটে …। এ – ওর মুখ চাওয়া – চাওই করছে । প্রত্যেকেই হতবাক – নির্বাক – অবাক । মুহূর্ত পরে , ওঘর থেকে রিতা আর মিষ্টির ফিসফিসানির শব্দ ভেসে আসতে থাকে । নিশ্চয়ই ওরা আত্মরক্ষার পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে । এদিকে , recording টা শুনতে শুনতে , মেয়ের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে নিতার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে ।

সুগত মাথা নিচু কোরে Recording টা শুনতে থাকে …। মুখে কোনও অভিব্যাক্তি নেই , শুধু চোয়ালটা ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছে । বাড়ির পরিবেশটা গুমোট হয়ে রয়েছে , ঠিক যেমন কাল বৈশাখী আসার আগে চারিদিকটা অন্ধকার হয়ে আসে ,স্তব্ধ হয়ে যায় , ঠিক তেমনই । ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর , আচমকা সুগত চিৎকার করে উঠে – সংহিতাকে বলে , “ এই Recording টা করে তুমি কি প্রমাণ করতে চাইছ ? অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছ । বন্ধ করো, এইসব আমি আর শুনতে চাইনা । আর একটা কথা , তুমি যা করেছো , তাতে কাল থেকে যদি মুন্নি’দি আর কাজে না আসে তাহলে আমাকে কিছু বলতে এসো না । আমি মেয়ের কোনও বাড়তি দায়িত্ব নিতে পারবোনা । মেয়ের দেখাশোনা তোমাকেই করতে হবে ।“  সুগতর কথাগুলো একের পর এক , বিষাক্ত তীরের মত বিদ্ধ করতে থাকে সংহিতাকে । বাড়ির অন্যদের সামনে , বিশেষত মুন্নির সামনে  এই কথাগুলো শোনার  পর , অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করে সংহিতার । সুগতর প্রত্যেকটা কথার যথাযথ উত্তর সংহিতার কাছে থাকলেও ,- রাগে , ভয়ে , লজ্জায় , অভিমানে একটা কথাও সে বলতে পারে না । সুগতর কথার অভিঘাতে , সংহিতার পা দুটো অসাড় হয়ে আসে , শরীর শিথিল হয়ে পরে , জলে ঝাপসা চোখ দুটোর দৃষ্টি একদম স্থির হয়ে যায় ,গাল বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা । ধপ করে বসে পরে চেয়ারে । মাকে কাঁদতে দেখে, ছোট্ট মালাই ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে । নরম তুলোর মতো ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে , - “ কাঁদে না মাম্মাম , এই তো আমি এতে গেতি , আল কক্কনও তোমায় বকু কলব না ।“ গলা জড়িয়ে মায়ের গালে একটা চুমু খায় । সংহিতার যেন সম্বিত ফেরে । মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে , “ যাও মা , তুমি ঘরে গিয়ে খেল ।“ নিতা’ও আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা । নাক টানার শব্দেই বোঝা যায় যে নিতাও কাঁদছে । কায়দা করে চোখটা মুছে নিয়ে নিতা , সংহিতাকে বলে – “ আয় না তোর ঘরে গিয়ে বসি “। সংহিতার ঘরে বসে নিতা সম্পূর্ণ recording  টা শুনতে থাকে। ইতিমধ্যে, সুগতও একটু fresh হয়ে  নেয় । সারা বাড়ি থম্থমে হয়ে আছে । ফিসফিসানির শব্দ ভেসে আসে পাশের ঘর থেকে । সংহিতা নিজের ঘরে ,এক কোনে ,স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে । তার জীবনের হিসাবগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায় । সে ভেবেছিল এক আর হয়ে গেল আরেক । তবে , recording টা শোনার পর , সুগত যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া করতে পারে , সে ব্যাপারে সংহিতা কিছুটা হলেও নিশ্চিত ছিল , আর সেই জন্যই সে আজ নিতাকে আসতে বলেছে । মা কাছে থাকলে তার পক্ষ নিয়��� অন্তত কিছু তো বলবে। নয়তো , বিয়ের পর থেকে সংহিতা এ বাড়িতে মানসিক ভাবে একাই । বাকিরা সবাই অন্য দলের…।

                    সুগত আবার নতুন উদ্যমে অশান্তি শুরু করে । চিৎকার করে সংহিতাকে বলে – “ তুমি এটা করলে কেন ? কেন ? জানি , তুমি  এ বাড়িতে থাকতে চাও না , আমার পরিবারের সাথে মানিয়ে চলতে পারনা ,তুমি শুধু আমাকে আর মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে চাও । তার জন্য এত কিছু…? এই নোংরা ষড়যন্ত্র……? ছিঃ ! “ নিতা নিজের মেয়েকে খুব ভাল করে চেনে । সে জানে , সংহিতা যুগ্ম পরিবারে মানুষ হয়েছে , তাই পরিবারের সকলের সাথে মানিয়ে চলতে পারে এবং সকলের সাথে থাকতে ভালবাসে । তাই সুগতর দেওয়া অপবাদ , সংহিতা মাথা নিছু করে মেনে নিলেও , নিতা আর বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে না পেরে বলেই ফেলে , “ সুগত তুমি ওকে এত কথা শোনাচ্ছ কেন , ও তো নিজেই  ষড়যন্ত্রের শিকার । এমনকি ওরা তোমাদের ছোট্ট মেয়েটাকেও পর্যন্ত ছারেনি । তোমার বাবা – মা- বোনের সামনেই মুন্নি ওকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেছে , এমনকি মেরেওছে । আর তারা প্রতিবাদ তো করেইনি , বরং মুন্নির কাজে সায় দিয়েছেন । তুমি আজও সেই ওদের পক্ষ নিয়েই কথা বলছ …?”

নিতার কথা শুনে সুগত একটু যেন অবাক হয় । খানিকক্ষণ চুপ করে বসে কি যেন চিন্তা করতে থাকে । তারপর I-pad টা হাতে নিয়ে recording টা প্রথম থেকে শুনতে শুরু করে । সবাই চুপচাপ , কারো মুখে কোনও কথা নেই । মালাইটাও খেলতে খেলতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরেছে । এত স্তব্ধতার মধ্যে recording টা আরও পরিস্কার শোনা যাচ্ছে । প্রতিটা শব্দ গমগম করে সুগতর কানে বাজছে । প্রতিটা বাক্য যেন নিজেদের চরিত্রের কথা সুগতর কানে কানে বলছে । আবার বলছে ...। আবার বলছে ...।

                   রাত ৯’ টা বাজে । এতক্ষণ মুন্নি চুপ করে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল । অপেক্ষা করছিলো কখন রাত ৯ ‘ টা বাজবে আর ও বাড়ি চলে যাবে । গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢুকে নিজের ব্যাগটা কাধে নেয় , এবার সে চলে যাবে । সংহিতা বলে , – “মুন্নি তুই চলে যা , কাল থেকে আর তোকে কাজে আসতে হবেনা । পরে একদিন এসে , এমাসে যতদিন কাজ করেছিস , হিসাব করে সেই টাকাটা নিয়ে যাস । আজ আমার কোন কিছু ভাল লাগছেনা । তুই যা । “ সংহিতার কথা শেষ হতে না হতেই সে গটগট করে চলে যায় । যেন হাফ ছেড়ে বাচল । আসলে , এত বড় একটা অপরাধের শাস্তি যে শুধু ক্ষমা হতে পারে , সেটা হজম করা ওর মতো এক জন বিশ্বাস ঘাতকের পক্ষে বেশ কঠিন । সংহিতা ওর জন্য কি না করেছে । ওকে নিজের বড় দিদি বই কাজের লোক কোন দিন ভাবেনি । নিজের সব কথা ওর সাথে share করেছে । প্রয়োজনে ওর উপদেশও নিয়েছে । নিজের জামাকাপড় , bed room , আলমারি সবই  share করেছে ওর সাথে । সবার সাথে ওকেও একই টেবিলে খেতে দিয়েছে । আবার কাজে ফাঁকি দিলে বকাবকিও করেছে । কিন্তু ওকে কখনই বায়রের লোক ভাবেনি । - আজ তার এই পরিণাম পেল সংহিতা …?

                    সংহিতার মনে বারবার একটাই প্রশ্ন ঘোরাফেরা করতে থাকে , মুন্নি বিশ্বাসঘাতকতা করল কেন ? একটু চিন্তা ভাবনা করেই ,  অতীতের কয়েকটা ঘটনার সঙ্গে আজকের recording এ ওদের কথা বার্তার সংযোগ ঘটিয়ে খুব সহজেই দুই’এ দুই’এ চার করে ফেলে সংহিতা । উত্তরটা সংহিতার কাছে এখন জলের মত পরিষ্কার । - শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য , সুগতকে নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখার জন্য , সুগত- সংহিতার মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য , সংহিতাকে এই বাড়ি ছেরে চলে যেতে বাধ্য করার জন্য , রিতা – অমিত – মিষ্টি প্ল্যান করে মুন্নিকে শুধু ব্যবহার করেছে , মুন্নির অসততা’কে কাজে লাগিয়েছে । প্ল্যান অনুযায়ী , প্রথমে ওরা নিজেদের মত করে , বানিয়ে বানিয়ে মুন্নিকে বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করে । যেমন – কখনো বলেছে , “ জানো মুন্নি , সংহিতা বলেছে তুমি নাকি ওর টাকা – পয়সা চুরি করো ।“ আবার কখনও বলেছে , “আজ তোমার কাজে আসতে এ���টু দেরি হয়েছে তাই সংহিতা তোমাকে উদ্দেশ্য করে কতো কিছুই না বলল…! “। এইভাবে ওরা মুন্নির বিশ্বাস অর্জন করে ওকে নিজেদের দলে টানে । আর সত্যিকারের অশিক্ষিত মুন্নি এটা বুঝতে পারে না , যারা কাজের লোকের কাছে নিজের ঘরের বউ এর নিন্দা মন্দ করে , বউ এর বিরুদ্ধে কাজের লোকের কাছে লাগানি – ভাঙ্গানি করে তারা আর যাই পারুক ওর ভাল কখনই চাইতে পারে না । তবে , নিন্দা – মন্দ , লাগানি – ভাঙ্গানি পর্যন্ত তবু ঠিক আছে , কিন্তু এর পর যা ঘটেছে , সেটা হিন্দি বা বাংলা ধারাবাহিকের থেকে কোনও অংশে কম নয় । - রিতা একদিন সুগতকে ডেকে  বলে , “ আজ মুন্নি আমাকে বলেছে ওর মাসিক পাঁচ হাজার টাকায় পোষাচ্ছে না ,আরও এক হাজার টাকা বাড়াতে হবে । আর এই কথাটা মুন্নি আমাকে বলেছে , তোর বউকে বলতে পারেনি । কারণ , তোর বউ এর যা মেজাজ হয়েছে আজকাল ......! তুই কিন্তু সংহিতাকে কিছু বলিস না । তুই বরং আমাকে এক হাজার টাকাটা দিয়ে দিস , আমি মুন্নিকে দিয়ে দেব । আসলে এত ভাল আয়া তো খুজলেও পাওয়া দায় , তাই বলছি...।“ সুগত বরাবরই একটু বেশিই মাতৃ ভক্ত । মায়ের মুখ নিঃসৃত বাক্য সুগতর কাছে বেদবাক্যেরই সমান । সে মায়ের প্রস্তাবে তক্ষুনি রাজি হয়ে যায় । এদিকে রিতা কিন্তু মুন্নিকে মোটেই জানায় না যে বাড়তি এক হাজার টাকাটা সুগত দিচ্ছে । বরং মুন্নিকে বলা হয় যে , “ মুন্নি তুমি কাজ ছেড়ে চলে যেওনা , আমি তোমাকে নিজের হাত খরচের টাকা থেকে এক হাজার টাকা করে প্রত্যেক মাসে দেব ।“ ব্যাস ! কিস্তি মাত ...! মুন্নি তক্ষুনি ওদের কেনা গোলাম হয়ে যায় । আর মুন্নির লোভকে কাজে লাগিয়ে ওরা , মালাই আর সংহিতার জীবনটা চিরকালের মত নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে ।

                   এতক্ষণে সুগতর সম্পূর্ণ recording টা শোনা শেষ হয় , I-pad টা   shut down করে , চোখ থেকে চশমাটা খুলে চোখের কোণা দুটো হাতের ���ঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে মাথা নিচু করে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে সুগত । যেন কায়দা করে চোখের জলটা মোছার চেষ্টা করছে । recording এর প্রথম দিকটা শুনে সুগতর মনে হয় , নিছকই  শাশুড়ি – বউমার স্বাভাবিক অশান্তির অংশ বিশেষ , কিন্তু যে মুহূর্তে সে শোনে ,তার অত্যন্ত কাছের মানুষেরা , তার নিজের লোকেরাই , তার ছোট্ট মেয়েটাকে অশ্রাব্য ভাসায় গালাগালি করছে , মুন্নির হাতে মালাইএর মার খাওা’তেও সায় দিচ্ছে , সংহিতার উদ্দেশ্যে নোংরা কথা তো বলছেই , এমনকি নিজেদের ছেলে সম্পর্কেও মুন্নিকে খারাপ কথা বলতে ছারছেনা ……… সেই মুহূর্তে সুগতর কাছে নিজের পরিবারের চিত্রটা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় । মনে পরে যায় সেইসব কথা , যেগুলো সংহিতা অনেকদিন ধরেই তাকে বোঝাতে চেয়েও বোঝাতে পারেনি । আসলে সুগত কোনোদিন সত্যিতা বুঝতেই চায় নি , আর বোঝাতে চেয়েছে বোলে অযথা আশান্তি করেছে সংহিতার সাথে । সুগত দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি , পরিবারের প্রতি তার অন্ধ বিশ্বাস , আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই একদিন তার নিজের জীবনটা তচনচ করে দিতে পারে । যন্ত্রণায় সুগতর বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছে । মা’কে সে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে , তবে কি সেই মা’ই তার প্রাণ – ভ্রমর’টা কে হত্যা করবে …? সুগত চিরকাল বিশ্বাস করেছে – পিতা ধর্ম , পিতা কর্ম ; তবে কি সেই পিতাই সবচেয়ে বড় অধর্মটা করবে………? সুগত বোনকে এতকাল নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করে এসেছে  ; তবে কি সেই বোনই তার নিজের সন্তানের জীবন বিপন্ন করতে এগিয়ে আসবে……? – এইসব কথা ভেবেই সুগতর চোখ জলে ভরে ওঠে । চোখের জলটা মুছে , চশমা পরতে পরতেই সুগত , সংহিতাকে বলে –“ তুমি মুন্নিকে ছেড়ে দিলে …? ওকে চলে যেতে দিলে কেন…?” চরম অভিমানের ফলে , বুঝে আসা কাঁপা কাঁপা গলায় সংহিতা উত্তর দেয় – “ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর ত কোনও উপায় ছিল না । কে বলতে পারে , আমি ওকে কিছু বললে তুমি ওর সামনেই আমার গালে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় কষিয়ে দিতে না ? তোমাদের বাড়িতে আসা ইস্তক , কম অপমানিত আমি হইনি , আজও হয়েছি , তাই যেচে আরও  একবার অপমানিত না হয় নাই বা হলাম ।“ সুগত কথাটা শুনেই সংহিতার দিকে একবার তাকিয়েই চোখটা নামিয়ে নেয় । অনুশোচনার ভারে এমনিতেই তার মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে । আজ সুগত সত্যিই বুঝতে পেরেছে যে , মালাই আর সংহিতার সাথে কি কি অন্যায় করা হয়েছে …যে অন্যায়ের একজন ভাগীদার পরোক্ষ ভাবে সে নিজেও । সুগত অনুতপ্ত । সে বুঝতে পেরেছে  , সংহিতাকে একটু বিশ্বাস করে ওর কথাগুলো আগেই  মেনে নিলে , বা অন্তত বোঝার চেষ্টা করলে , ছোট্ট মালাইটাকে হয়ত  এত অত্যাচার সহ্য করতে হত না , মার খেতে হত না । সুগত খুবই কষ্ট পেয়েছে এটা বুঝতে পেরে , যে তার একান্ত আপনজনেদের কারণেই মালাই এর অসুস্থ থাকার দিনগুলোর সংখ্যা রোজ একটু একটু করে বেড়ে গেছে । তার আদরের ছোট্ট মেয়েটা কত অযত্নে , কত হেলাফেলায় থেকেছে এই বাড়িতে । আর সেই জন্যই  প্রত্যেক সপ্তাহে , একবার বা দুবার কোন না কোন কারণে মালাইকে  ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেই হয় ; আজ জ্বর , কাল সর্দি , পরশু পেটে  infection , তারপর বমি , কাশি , টনসিল , কেটে ছড়ে যাওয়া , গুঁতো খেয়ে ফুলে যাওয়া তো লেগেই আছে । মেয়েটা এত রোগা হয়ে গেছে , যে ওকে নিয়ে রাস্তায় বেরোলেই প্রত্যেকে জিজ্ঞেস করে , - “ মালাই এত রোগা হয়ে যাচ্ছে কেন ? “ তখন উত্তরটা না দিয়েই মুচকি হেসে চলে যেতে হয় । আর এতকিছুর পর ,এত কষ্ট সহ্য করেও মালাই ভয় পেয়ে, মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতেও পারেনি । এই তিক্ত সত্যিটা জানতে পেরে  আজ সুগত নিজেই নিজের চোখে অপরাধি ।

                   আজ সংহিতা সারারাত শুধু কেঁদেছে । ভেবেছে  নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা । সে তো সবাইকে নিয়ে , একসঙ্গে , ভাগাভাগি করে , আনন্দ করে , মজা করেই থাকতে চেয়েছিল । কিন্তু, মিষ্টির বাড়িতে অর্ধ – উলঙ্গ হয়ে থাকায় , রিতার কুকুরের মল – মুত্র – বমি পরিষ্কার করে সাবান দিয়ে হাত না ধোওয়ায় ,অমিতের দি���-রাত drink করায় আপত্তি জানিয়েছে বলে কবে যেন সংহিতা ওদের কাছে পর হয়ে গেছে , বায়রের  লোক হয়ে গেছে , শত্রু হয়ে গেছে । সে তো কোন অন্যায় করেনি । তাছারা , মালাই তো একটা নিস্পাপ শিশু , ওর তো কোন দোষই নেই , তবে ওর সঙ্গে কিসের শত্রুতা ? শুধুমাত্র সংহিতার সন্তান বলেই ওকে শাস্তি পেতে হবে ? এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি …?

                   আজ রাতে সুগতও দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি । সারারাত শুধু ভেবেছে – কাল কিভাবে নিজের একান্ত আপনজনদের মুখমুখি হবে ? মালাই তার জীবনে আসার আগে পর্যন্ত বাবা – মা – বোনই ছিল তার জগত আর আজ তাদের কথা ভেবেই ঘৃণা হচ্ছে । তাদের মুখদর্শন করবে কি করে । সুগতর কাছে আজ তার চেনা মানুষগুলোই প্রচণ্ড অচেনা । সংহিতা আজ ওদের মুখোশটা টেনে খুলে ফেলেছে ; বেরিয়ে এসেছে মুখশের পেছনে থাকা বীভৎস কদাকার চেহারাগুলো , যা দেখে শুধু ঘৃণা আর বমি ছাড়া কিছুই আসেনা । অতীতের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর আজ সুগত খুজে পেয়েছে । ভেবেই ভয় পেয়েছে যে , মালাইএর আরও বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারত । মালাইকে যদি আর………!!!  বালাই ষাট !!!

                  

                    সকালটা বড় অচেনা । আজ অনেক কিছুই আর আগের মত নেই , - পাল্টে গেছে বাড়ির পরিবেশ , পরিস্থিতি , পুরনো সম্পর্ক । বাড়িটা যেন বাড়ি নয় শ্মশান । প্রত্যেকটা মানুষ মুখ বুজে , যার যার নিয়ম কাজ করে চলেছে । সুগত চা আর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে ……মনে হচ্ছে এত বেস্বাদ চা সে কখন খায়নি , খবরের কাগজে কোন ভালো খবর নেই । কাগজটা ভাজ করে টেবিলে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে সুগত ; তারপর , সোজা মায়ের ঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে “ কেন তোমরা এইরকম করলে ? কেন করলে ? আমরা না হয় তোমাদের পাকা ধানে মই দিয়েছি , কিন্তু ছোট্ট মালাই তোমাদের কি ক্ষতি করেছে ? ওকেও তোমরা রেয়াদ করলে না...? ওর যদি কোন বড় ক্ষতি হোয়ে যেতো ? ছিঃ...!   রিতা নিজেদের কৃত – কর্মের জন্য বিন্দু মাত্র লজ্জিত না হয়ে , সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় – “ এই সবই তোর বউএর ষড়যন্ত্র , তোর সাথে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়ার জন্যই ও এই প্ল্যানটা করেছে ।“ এবার সুগত আর নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে , রাগে , ক্ষোভে ফেটে পড়ে । বিকট চিৎকার করে সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দিতে থাকে । যেমন বদ হজম হলে , গলগল করে বমি হয় , গলা – বুক জ্বলে যায় , চোখ থেকে অনবরত জল পরতে থাকে , ঠিক তেমনই । সুগত এই প্রথমবার সংহিতার পক্ষে কথা বলেছে । মায়ের কথার উত্তরে সুগত বলে – “ recording টা প্ল্যান হতে পারে কিন্তু recording এর কোথাগুলো তো মিথ্যে নয় ।“ সুগতর চিৎকার শুনে , সংহিতা রিতার ঘরে যায় , সুগতর হাত দুটো ধরে বলে “ শান্ত হও , শান্ত হও , চলো এখান থেকে ।“ কিন্তু নিজের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না নিয়ে আজ সুগত কিছুতেই যেতে চায় না । ফলে তর্ক , কথা কাটাকাটি , ঝগড়া , আশান্তি বেড়েই চলে ।

রিতা ঃ – যাঃ ! বউএর হাত ধরে এখান থেকে চলে যা । তোকে আমি আর সহ্য               করতে পারছিনা ।

সুগত ঃ – হ্যাঁ , আজ তুমি তো আমাকে সহ্য কোরতে পারবেই না কারণ আজ প্রথম বার আমি তোমাকে কোন প্রশ্ন করেছি । এত দিন তুমি যা বলেছ তাই শুনেছি , যা বুঝিয়েছ তাই বুঝেছি , এমনকি যা করতে বলেছ তাই করেছি । কোনদিন কোন প্রশ্ন করিনি । খুব ভুল করেছি ।

অমিত ( বিদ্রুপ করে  ) ঃ – তাহলে , এখন থেকে আর আমদের কথা শোনার দরকার নেই , তুমি বরং সারাজীবন স্ত্রৈণ হয়েই থেকো । যাও , বউএর হাত ধরে নিজের ঘরে চলে যাও ।

সুগত ঃ- একদম ঠিক । ওর হাতই আমার ধরা উচিত । তোমাদের প্ররোচনায় , যে অন্যায় – অবিচার আমি ওর সঙ্গে করেছি , এবং তারপরেও যে ও আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি তারজন্য আমি ওর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব ।

রিতা ঃ- ছেড়ে চলে যায়নি , উদ্ধার করে দিয়েছে …!

এই ক���া কাটাকাটি প্রায় দু’ঘণ্টা চলতে থাকে । সুগত যেন দেখতে পায় ত���র সাজানো তাসের ঘর, তার নিজের চোখের সামনেই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পরে যাচ্ছে । আর, সে কিছুই করতে পারছে না  । সুগতর বুকের ভেতরটা  হাহাকার করে ওঠে , চোখ ভিজে ওঠে , শরীরের সমস্ত পেশীগুলো যেন শিথিল হয়ে পরে । নিজেকে কোনোমতে সামলে নেয় সুগত … ।

সুগত ঃ – আমি ঠিক করেছি মালাই আর সংহিতাকে নিয়ে , এক সপ্তাহের মধ্যে এখান থেকে চলে যাবো ।

রিতা ঃ – তাহলে , আমাদের চলবে কি করে ?

অমিত ঃ – তোকে মানুষ করতে যে পরিমাণ টাকা খরচ করেছি তা সুদে – আসলে শোধ করে তবে এখান থেকে যাবি ।

মিষ্টি ঃ – আর টাকা পয়সার অভাবে , চিন্তায় চিন্তায় যদি বাবা – মার কিছু একটা হয়ে যায় , তবে তার দায় কিন্তু তোদের । আমি অন্তত পুলিশকে তাই বলব ।

সুগত ঃ- একটা কথা মনে রেখো , আমি চাইলেও কোনোদিন তোমাদের মত হতে পারবোনা। তোমাদের মত এত নিচে নামতেই পারবোনা । চিন্তা করো না , আমিই তোমাদের সমস্ত খরচ বহন করবো , ঠিক যেমন ১৬ বছর বয়স থেকে করে আসছি । আর যদি বল , আমার জন্য যত টাকা খরচ করেছ তা সুদে আসলে শোধ করতে হবে , তাহলে তোমরা তো নিজেরাই খুব ভালভাবে জানো যে ছোটবেলা থেকে দুবেলা পেট ভরে খেতেও পাইনি , পরীক্ষার ফল খুব ভাল হত বলে মাস্টার মশাই’রা বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন । তাই সেই হিসাব টা করতে গেলে তো তোমাদেরও এক বেলা কোন রকম খেয়ে থাকতে হবে , আর এত বড় ফ্ল্যাটেও থাকা হবে না । কাজেই সেই হিসাব না করাই ভাল ; আমি আমার সব দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো ।

এতক্ষণে রিতা , আমিত , আর মিষ্টি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে – খাদ্য , বস্ত্র , বাসস্থান তিনটির ব্যাবস্থাই পাকা । ফ্ল্যাটের পুরো দাম সুগত চোকালেও , রিতা বেশ কায়দা করেই পুরো ফ্ল্যাটটা নিজের নামে করে নিয়েছে । আর সুগত যখন বলেছে সম্পূর্ণ  খরছ ওই চালাবে , তখন ও সেটা করবেই এবং ওষুধ – পথ্য , ডাক্তারের খরচ , অনুষ্ঠান সংক্রান্ত খরচও যে সুগতই দেবে সে ব্যাপেরে ওরা একশ ভাগ নিশ্চিত ।

                   এতদিনে , সুগত নিজের অজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুজে পেয়েছে , সে বুঝতে পেরেছে সংহিতার কথাগুলো কতখানি সত্যি । কেন সংহিতা ওদের পছন্দ করত না – কারণ ও ওদের আসল রূপটা অনেক আগেই দেখে ফেলেছিল । কেন এত কাছাকাছি থাকা সত্বেও মামা-পিসি কাকা- জেঠা কেউ ওদের সাথে কোনও সম্পর্কই রাখেনা – কারণ তারাও নিশ্চয় এদের স্বভাব, এদের স্বার্থপরতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ।

                                                *****************************

                   এই চার বছরে ছোট্ট মালাই একটু বড় হয়েছে । ওর এখন ছয় বছর বয়স । ওর নতুন ঠিকানা এখন একটা ভাড়ার ফ্ল্যাট , সেখানে পাপা – মাম্মার সাথে থাকে মালাই । সংহিতা , মেয়ের পুরোপুরি দেখভাল করার জন্য , চাকরি ছেড়ে আজ আদ্যপান্ত একজন গৃহবধূ । মালাই ভীষণভাবে ওর  পাপার মত , খুব মা- ভক্ত । মা’কে একদমই সে চোখের আড়াল করতে চায়না । বাড়ি , স্কুল , নাচ , আঁকা , সাঁতার ,আবৃত্তি – সব জায়গাতেই মালাইএর মা’কে চাই । কিন্ত ছুটির  দিনগুলোতে ওর খুব মন খারাপ হয় – আম্মু , দাদু , পিপি , পলি সবাইকে খুব miss করে । ও তো ছোট , তাই সাংসারিক রাজনীতি , স্বার্থপরতা  , ছলচাতুরী , বঝেনা ; তাই নিজের লোকের জন্য ওর ভালোবাসা এতটুকু কমেনি । এটা তাদের দুর্ভাগ্য যারা এই নিঃস্বার্থ ভালবাসার মর্ম বোঝেনি । - এই ফ্ল্যাট টা ভাড়ার হলেও এখানে – সুখ আছে , শান্তি আছে , নিজস্বতা আছে , সম্মান আছে , সৌন্দর্য  আছে , ভালবাসা আছে ।  আর শুধু তার সঙ্গে রয়েছে এক টুকরো আফসোস ; ইশশশশশশ……! ওরা যদি একটু স্বাভাবিক হত , একটু কম স্বার্থপর  হত , যদি অন্যদের একটু ভাল বাসতে পারতো………… তাহলে কি ভালোই না হত …!!!

                                                ______________________________

 

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day