মায়ের সাথে আমিও……
1578
6
3
|   Jul 24, 2017
মায়ের সাথে আমিও……

         ছোটবেলা থেকে শুধু মা’কেই পেয়েছি , নানা রুপে পেয়েছি , অনেক্ষানি পেয়েছি । আমার জীবনে আমার মা একাই অনেক গুলো ভূমিকা পালন করেছে – বাবা , মা , শিক্ষক , অন্নদাতা , বন্ধু , পথ প্রদর্শক ………আবার কখনও আমার ছোট্ট মেয়েটি । আমার বাঁচতে পারা , বেঁচে থাকা , সবটাই মায়ের জন্য , মা’কে নিয়ে , মায়ের সাথে । আমার কাছে , আমার নিজের থেকেও বেশি নিজের আমার মা । আর তো কাউকে এত নিজের করে কক্ষনও পাইনি আমি ।

            সেই কোন ছোটবেলায় বাবাকে শেষ বারের মত দেখেছি , বাবার মুখটাও মনে পরেনা । শুধু ছোটবেলার ভয়ঙ্কর , অভিশপ্ত স্মৃতি গুলো মন থেকে যেতেই চায়না , মনের মধ্যে একেবারে জাঁকিয়ে বসেছে । কারণে – অকারণে উকি – ঝুঁকি মারতে থাকে । তাই মাঝে মধ্যেই মনে পরে যায় ছোটবেলার সেইসব দিন গুলোর কথা যখন আমার ঠাকুরমা , কাকা , পিসি – সকলের উস্কানিতে আমার বাবা ,  আমার মা’কে চোরের মার মারত । আর মা এত মার খেয়েও মাটি কামড়ে সেইখানেই পড়ে থাকতো । আসলে মা আমাকে বঞ্চিত করতে চায় নি । তাই নিজের ক্ষমতার বায়রে গিয়েও মা বার বার মানিয়ে নিয়েছে । জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি , মা খাবারের থেকে বেশি মার’ই খেয়েছে । রোগা , শীর্ণ - জীর্ণ , চেহারা ; হাড় সর্বস্ব শরীরে না ছিল মাংস , না ছিল মেদ ( যাকে বাংলায় বলে স্নেহপদার্থ )। কিন্তু ঐ পাথর কঠিন শরীরের  প্রতিটা অঙ্গ থেকে উথলে পরত আমার প্রতি স্নেহ , মায়া , মমতা , আদর । সাংসারিক আশান্তিতে জেরবার হয়ে মায়ের তো কোন কোন দিন একবেলাও খাওয়া হত না । আর দু’বেলাই মা ভালো করে খেয়েছে এমন দিন তো হাতে গোনা । কিন্তু আমার এমন কোন দিনের কথা মনে পরে না , যেদিন আমি একবেলাও না খেয়ে থেকেছি । পৃথিবী তোলপাড় হয়ে গেলেও আমার প্রতি কোনোদিন কোন কর্তব্যের  খামতি রাখেনি মা । তাই আজও আমার কাছে , আমার সবটুকুই আমার মা ।

            মা সেইদিন থেকে আমার মা – যেদিন আমার জীব বৈজ্ঞানিক বাবার  ( biological father ) মুহূর্তের উত্তেজনায় আমার মায়ের শরীরে মাতৃত্বের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে আমার জন্মের সূচনা হয়েছিল। মা সেইদিন থেকে আমার শিক্ষক – যেদিন আমি প্রথম সূর্যের আলো দেখেছিলাম । মা সেইদিন থেকে আমার অন্নদাতা – যেদিন আমি ঈশ্বরের দেওয়া সর্ব শ্রেষ্ঠ খাদ্য অর্থাৎ মাতৃ দুগ্ধের স্বাদ পেয়েছিলাম । মা সেইদিন থেকে আমার খেলার সাথী – যেদিন প্রথম বার ধরা-ধরি খেলার মজা অনুভব করেছিলাম ।মা সেইদিন থেকে আমার বন্ধু – যেদিন প্রথম আমি ঋতুমতী হয়েছিলাম । আর মা সেইদিন থেকে আমার বাবা – যেদিন বাবার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ।

                                                **********************************

            ১৯৯২ সাল , আমার তখন সাত বছর বয়স ।সেই বছর দোলের দিন , পাড়ার সব বাচ্ছারা রং খেলতে বেরোবে বোলে , মা’ও  আমাকেও সকাল সকাল খাইয়ে – দাইয়ে , চুল বেঁধে , গায়ে – হাতে ক্রিম মাখিয়ে , পুরানো জামা পরিয়ে , একদম তৈরি করে দিয়েছিল । আমার সঙ্গে রং , বালতি , বেলুন , পিচকারি সব ready । অথচ , আগের দিন থেকেই যে বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তির হাওয়া বইছিল তা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম । বয়স মাত্র সাত হলেও , ইতিমধ্যেই আমি এত আশান্তি চাক্ষুষ করে ফেলেছিলাম যে বিন্দুমাত্র ছন্দ পতন হলেই আমি বুঝে যেতাম , আজ আবার আমার মাকে ওরা ( বাবা , কাকা , পিসি , ঠাকুমা ) মারবে । সেদিন একদিকে রঙ খেলার আনন্দ আর অন্য দিকে মায়ের জন্য আমার চরম কষ্ট  মিলে – মিশে কি রকম যে এক মিশ্র অনুভূতি হয়েছিল তা আজ আর ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা । শেষ – মেশ  রঙ খেলেছিলাম বটে কিন্তু মায়ের গতি- বিধির ওপর আমার পুরো নজর ছিল । ঘণ্টা খানেক পর খেলা শেষ করে যেই মাত্র ঘরে ঢুকেছি , ওমনি হঠাত আমার বাবা শুধুমাত্র রঙ খেলেছি বলে আমাকে বেদম মারতে শুরু করে দেয় । আসলে , আগের দিন থেকেই বাবা অনেক খারাপ খারাপ কথা মা’কে বলছিল তবে  অশান্তির ভয়ে মা কোনও react করেনি । কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে, কোন প্রকারে একটা অশান্তি বাঁধিয়ে দিয়ে , সেই অশান্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমার বাবা সেদিন আমাকে মেরেছিল , যাতে মা react করতে বাধ্য হয় ; আর মা react করলেই তো মা’কে মনের আশ মিটিয়ে চোরের মার মারা যাবে । কারণ , আমার বাবার favourite entertainment ছিল আমার মা’কে মারা ; এছাড়া ঠাকুমা , কাকা , পিসি – দের খুশি করার একটা উপায়ও বটে । ঠিক তাই , সেদিন আমাকে মারের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যেইমাত্র মা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমার বাবারুপী দানবটিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে , ব্যাস ! তক্ষুনি দানব চরাও হয় মায়ের ওপর । সেবার প্রবল , প্রচণ্ড মার মেরেছিল মা’কে । সেই মারের দু-একটা ঘা সেদিন আমিও মায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম । বাবা মা’কে মারছে বলে আমি মা’কে জাপটে ধরেছিলাম , আর তখনি বাবার এলোপাথাড়ি লাথি , ঘুষির দু’একটা আমার ছোট্ট পিঠেও পরেছিল । কিন্তু মা সেই মারের একটি ভাগও আমাকে দিতে চায় নি , তাই আমার হাত ধরে আমাকে সেই প্রথম ও শেষ বারের মত সজোরে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় ।না হলে শত কষ্টের মধ্যেও মা আমাকে কোনোদিন নিজের কাছ থেকে দূর করেনি । অবশ্য সেদিন , সেই মুহূর্তে আমাকে দূরে সরিয়ে না দিলে আমি হয়তো আজ আর বেচে থাকতাম না । কারণ ঐ দু’একটা মারের অভিঘাতেই ততক্ষণে আমার বমি ও প্রস্রাব একই সাথে , আমাকে কিছু না জানিয়েই হয়ে যায় , আর কয়েক ঘা মার পড়লে হয়তো প্রাণ পাখীটাই না বলেই উড়ে যেতো …।

            তারপর , সব মার মায়ের ভাগেই পরে । আরও লাথি , আরও ঘুষি , কিল , চড় , থাপ্পড় ………। একনাগাড়ে মার খেতে খেতে , কিছুক্ষন পর মা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে । মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল মা বুঝি আমাকে ছেড়ে চলেই গেছে আকাশে । অসহায় আমি চিৎকার করে কেঁদেছিলাম , হাত জোড় করে ওদের বলেছিলাম ‘’ আমার মা’কে বাঁচাও , কিছু একটা করো ...।“ কিন্তু কেউ কিচ্ছু করেনি । সেদিন রূপকথার গল্প থেকে বেড়িয়ে আসা , সত্যিকারের মানুষরূপী – শয়তান , রাক্ষস , ডাইনি ,দানব সকলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো । বেশ কিছুক্ষণ পর , কারা যেন সেই গল্পেরই মুশকিল-আসানের মত এসে , গুরুতর জখম অবস্থায় মা’কে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল । খবর পাঠানো হয়েছিল মামার বাড়িতে । তারপর থেকেই আমাদের মা-মেয়ের ঠিকানা মামার বাড়ির ( বলা ভালো দাদুর বাড়ির ) একটা ঘর , যে ঘরে আলো – পাখা , খাট , আলমারি থাকলেও কোন প্রাইভেসি  ছিলনা । আর সেই দিন থেকেই আমার জীবনের অভিধান থেকে চিরদিনের জন্য মুছে গিয়েছিলো ‘ মামার বাড়ির আবদার ‘ কথাটি । কারন ততক্ষণে আমার অদৃষ্ট আমাকে জাদুর কাঠি ছুইয়ে , গিলি গিলি হোকাস ফোকাস করে , আদরের ভাগ্নি থেকে বাড়তি বোঝা বানিয়ে দিয়েছিল যে ।

            একটু সুস্থ হয়ে , হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতেই মামার বাড়ির সিংহভাগ কাজের দায়িত্ব এসে পরে মায়ের কাঁধে – জামা কাপড় কাচা , ঘরবাড়ি পরিস্কার করা , আনাজ কুটে রান্নার জোগাড় দেওয়া , কখন কখন রান্নাও করা । মা খাওয়া – পরার বিনিময়ে এই সব কাজ করতো ; কিন্তু শুধু খাওয়া – পরা ছাড়াও মায়ের হাতে কিছু টাকার দরকার ছিল কারণ , আমার পড়াশোনার খরচ বহন করতে তখন কেউ রাজী হয়নি । তাই মা ভোর চারটের সময় উঠে , বাড়ির সমস্ত কাজ সেরে নিজের কাজে বেরেত । মা তখন বড়বাজারের একটা শাড়ীর দোকানে কাজ করতো । হাড়ভাঙা ���াটুনি খেটে , রাত ৮’টায় বাড়ি ফির��� , তারপর আবার বাড়ির কাজ …। বাড়ির কাজে খামতি হলেই ঠারে – ঠরে বুঝিয়ে দেওয়া হত , আমরা গলগ্রহ , বাড়তি , অযাচিত । তখন অন্য কোন ভালো কাজ মায়ের জোটে নি কারণ , মা’কে অনেক কম বয়সে , একপ্রকার জোর করেই বিয়ে দেওয়া হয়েছিল । তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও , সাংসারিক চাপে পরে মা আর বেশি দূর পড়াশোনা চালাতে পারেনি । আর পরিনতির কথা বিবেচনা না করেই যারা কেবলমাত্র অর্থ প্রতিপত্তি’কেই আদর্শ মান বলে ধরে নিয়ে , বড়লোক পাত্রের সঙ্গে ধরে – বেধে মা’এর বিয়ে দিয়েছিল তারা কিন্তু নিজেদের সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল । কিন্তু মা কিছুতেই হার মানেনি , নিজের সবটুকু দিয়ে আমাকে বড় করে তুলেছে।

                                                ************************************

            আমার জীবনটা ঠিক আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বাভাবিক ছিলনা , বরং একটু অস্বাভাবিকই ছিল । আর আমার এই অস্বাভাবিক জীবনে , স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপেই আমি অনুভব করেছি যে আমি যেন সবার মত নই , একটু আলাদা । আর আমি যে সবার মত নই সেটা আমাকে প্রতি মুহূর্তে , দায়িত্ব নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল সভ্যতার মুখোশ ধারী এই সমাজ । চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল , আমি ঠিক ওদের দলের নই……… ।

  স্কুলের সহপাঠীরা  , এমনকি শিক্ষক – শিক্ষিকা’রাও কখনও বিদ্রুপাত্মক করুনা করেছে ,আবার কখনও করুনাত্মক বিদ্রুপ ঃ যেমন – সহপাঠীরা বলতো , “ কি রোজ একঘেয়ে টিফিন আনিস , আলুভাজা-রুটি, না হলে রুটি-তরকারি…… ও ও ও ও ও…! তোর তো বাবা নেই , কোথা থেকেই বা ……!! নেঃ , আমাদের থেকই একটু ভালোমন্দ খেয়ে নে । ( হা ! হা ! হা ! )  “ আবার কখনও শিক্ষকরা বলতেন , “ তোর তো আবার বাবা নেই , মায়ের ওপরই সব । সরস্বতী পুজার চাঁদা দিতে পারবি বলে তো মনে হয়না । যাকগে ! তোর নামটা বাদের খাতাতেই থাক । ( হা ! হা ! হা ! )

কলেজে পড়ার সময় সংখ্যা লঘুদের দলেই থেকেছি , যারা কোনোদিন কলেজ পিকনিকে যায়না , পূজার সময় এ-ওর বাড়িতে যায়না , নতুন বছরে কার্ড চালাচালি করে না বা বন্ধুত্ব দিবসে কারো হাতে ব্যান্ডও পরিয়ে দেয়না । প্রাণের বন্ধু বলে কেউই ছিল না , তবে দু’এক জন বেশ ভালো সহপাঠী ছিল , যাদের বন্ধু বলে চালিয়ে দিতাম ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও বন্ধু নির্বাচন করতে গিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল । ভয় পেতাম , পাছে কোনদিন আমার অতীতের কথা জানতে পেরে , ওরাও আমার কাটা ঘায়ে লঙ্কার গুড়ো সহযোগে নুন ছিটিয়ে না দেয়.........! তবে , সে যাত্রায় সেইরকম কিছুই হয়নি । সবাই আমার রূপে এমনই ফিদা ছিল যে আমার সৌন্দর্য ছাড়া ওরা অন্য কিছু ভাবতেই পারত না ।    

বয়সের দোষে , জীবনে বেশ কয়েক বার প্রেমও এসেছিল , তবে সেই প্রেম প্রেম খেলা গুলো বেশিদিন টেকে নি , কারণ – কখনও ভুল – বোঝাবুঝি , কখনও মতের অমিল , কখনও আবার ইগো । আজ বুঝতে পারি , প্রেম-টেম নিয়ে তখন মোটেই আমি খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না , আসলে একটা চরম মানসিক সঙ্কট ( psychological crisis ) এর বশবর্তী হয়েই আমি বারে বারে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতাম , মা ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কেউ আমাকে ভালবাসে কিনা…? এবং কতটা …? প্রত্যেক বারই , প্রথম প্রথম মনে হত সত্যি ওরা আমাকে ভালবাসে…… কিছুদিন পরই বুঝতে পারতাম , ওরা মোটেই আমার আমি’কে ভালবাসে না বরং ভালবাসে আমার Perfect vital statistic সমৃদ্ধ রূপটাকে । কিন্তু হঠাত একদিন আমার জীবনে হ্যালির ধূমকেতুর মত ছুটে এসে আছড়ে পরেছিল ‘ সত্যি কারের ভালবাসা ‘ । সেই ভালবাসা ছিল – ভুল বোঝাবুঝি , মতের অমিল , ইগো …সব কিছুর উরদ্ধে । খুব ভালবেসেছিলাম তাকে , আর সে’ও তো তাই’ই বলেছিল ……দিব্যি করে বলেছিল আমাকে অনেকটা ভালবাসে , আর সারা জীবন বাসবে…। ব্যাস ! গতি , ঘনত্ব , গভিরতা এই ত্রিমাত্রায় আমাদের প্রেম ফুলে-ফেপে উঠতে থাকে । আচমকা ,  একদিন সেই আছড়ে পরে ধূমকেতু, দ���উ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতেই হুশশশশ করে নিভে যায় । অজুহাতে সে বলেছিল – “ আমাদের বিয়েটা বোধ হয়  হবে না রে , তোর বাবা – মায়ের ছারাছারি হয়ে গেছে বলে আমার পরিবারের কেউ এই বিয়েতে মত দিচ্ছে না , বলছে , সবাই তো প্রশ্ন করবে……তখন কি বলব ?।“ কিন্তু আজ বুঝি , সমস্যাটা ওর পরিবারের নয় ওর নিজেরই ছিল । কারণ , একদিন নিউ মার্কেটে ওর এক বন্ধু’র সাথে আমার দেখা হয়েছিল সে’ই আমাকে বলেছিল – “ কিছু মনে করিস না …… ও কারো কাছে শুনেছিল যে single parent child’দের adjustment এর সমস্যা থাকে , তারা  মানিয়ে চলতে পারেনা ।তাই আর…… “। ওর সাথে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়েছিল , খুবই কষ্ট হয়েছিল । একবার তো ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করবো । কিন্তু এতটা স্বার্থপরতা আমি করতে পারিনি । যে মা আমার জন্য বাচে , আমাকে নিয়ে বাচে , আমাকে ঘিরেই যার সব স্বপ্ন , আশা , ভরসা ……তাকে আমি ঠকাতে পারিনি । ভাগ্যিস….! পরে অবশ্য শুনেছি , ও কোন এক বাপ-মা ওয়ালা মেয়েকেই  বিয়ে করেছে । কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস ! ওর স্ত্রী এখন ওকেই আর নিজের বাব-মা’র সাথে যোগাযোগ  রাখতে দেয়না , আর মানিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা ।

                        *************************************************

আমার বিয়ের বয়স হতে না হতেই , উপযাচক হয়ে পাড়ার লোকেরা , আত্মীয় স্বজনেরা মা’কে বলতো – “ আর দেরি করিস না , এখন থেকেই মেয়ের বিয়ের ব্যাবস্থা কর , মাথার ওপর বাবা নেই , তোর মেয়ের জন্য পাত্র পাওয়া কিন্তু সহজ কথা নয় , তা সে যতই তোমার মেয়ে রূপে লক্ষ্মী , গুনে সরস্বতী হোক না কেন ...। মা কিন্তু কারো কথা শোনেনি । মা চায় নি আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে । মা শুধু বলতো – “ একজন ভালো মানুষ হও , নিজের পায়ে দাড়াও  আর কোনোদিন কারো ওপর নির্ভরশীল হয়ে থেকনা ।“ মায়ের কাছে বিয়ে’টা প্রাথমিক ছিলনা , স্বনির্ভর হওয়াটা ছিল প্রাথমিক । কথায় বলে , ঘর পোড়া গরু , সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায় । মায়ের কাছে বিয়ে ব্যাপারটাই ছিল আগুনের মত ভয়ঙ্কর । তাই চাকরি নামক প্রতিরোধকটি সঙ্গে না নিয়ে , মা কিছুতেই আমাকে বিয়ে নামক আগুনের দিকে ঠেলে দিতে রাজী হয়নি । লোকে , মায়ের জন্য স্বার্থপর , সুবিধাবাদি  মার্কা বিশেষণ ব্যবহার করেছে ঠিকই , কিন্তু মা তাও  পরোয়া করেনি ।

দেখতে দেখতে একদিন , মায়ের চিরকাম্য , চিরপ্রতীক্ষিত সেই দিনটি আমাদের জীবনে এল , যেদিন আমি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই এবং একটি সরকারি হাই স্কুলে শিক্ষিকা হিসাবে যোগদি । সেদিন সব থেকে বেশি খুশি হয়েছিল মা , আমার থেকেও বেশি …। স্কুলটা ছিল মামার বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে , তাই প্রথম দু’তিন দিন মা’ও আমার সঙ্গে যাতায়াত করেছে । কারণ রাস্তা – ঘাট  সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বরাবরই একটু কম । তাছাড়া দেখতে-শুনতে ভালো ছিলাম বলে , জায়গাটা সরে জমিনে তদন্ত না করে , মা প্রথম দিনই আমাকে  অতদুরে , একেবারে একা ছাড়তে চায়নি । এদিকে স্কুলে জয়েন করার পর পরই, স্কুলের কোন লবিতে আমি থাকবো তা নিয়ে  দিদিমনি – মাষ্টারমশাইদের মধ্যে কান ফিসফিস শুরু হয়ে গেছে । তাছাড়া আমাকে নিয়ে তো কোনকালেই কারো কৌতূহলের অভাব ছিল না , আর সেখানেও যে তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি সেটা দু’তিন দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম । নিজের কাজ বুঝে নেব কি , সহকর্মীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেত । সারাদিন ভাবতাম – কোন প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দেব ? উত্তরটা ঠিক কতটা দেব ? আদও উত্তরটা দেব , নাকি এড়িয়ে যাবো ? – এইসব ভাবতে ভাবতেই প্রথম দু’মাস ফুড়ুৎ করে উরে গেলো । সে তাদের বিভিন্ন , বিচিত্র সব প্রশ্ন – প্রথমে , ‘’ বাড়ি ঠিক কলকাতার কথায় ?’’ , তারপর , “ বাড়িতে কতজন আছে ? কে কে আছে ?” , তারপরই , “ boyfriend আছে ?” , “ কবে বিয়ে করবে ?”  , “ বিয়ের জন্য ছেলে দেখব নাকি ?” আর একদিন তো ���কজন জিজ্ঞেস করেই বসলেন , “ এই শোনো , তো���ার মা তো সিঁদুর পরেন না , আবার রঙিন শাড়ি পরেন…….তা তোমার বাবা আছেন না নেই ?” আমার ধারনা , বাবা যে নেই সেটা জেনেই আমাকে প্রশ্নটা করেছিলেন , কারণ , “বাড়িতে কে কে আছেন” - এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই তো তথ্যটা ছিল ……। যাইহোক , বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলা আমার ধাঁতে নেই, কোন কালেই আমি এই বিষয়ে পটু ছিলাম না , তাই সেদিন সব অবান্তর প্রশ্নেরই ঠিক ঠিক উত্তরই দিয়েছিলাম । উত্তরটা শুনে , কেমন যেন সবার মুখের অভিব্যাক্তি’গুলো পাল্টে গিয়েছিল , আমিও একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম । সেদিন বেশির ভাগ সহকর্মীই আমাকে সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আমার পেছনে, সেই বেশির ভাগ সহকর্মীদের মধ্যেকার বেশিরভাগই কিন্তু অন্য কথা বলেছিলেন । তাদের কত আলোচনা , কান ফিসফিস , মতামত……!

ততদিনে , আমি এইটুকু বুঝে গিয়েছিলাম , যেসব মেয়েদের বাবা নেই তাদের জন্য আমাদের সমাজে কিছু অলিখিত নিয়ম আছে । বাবা’ওয়ালা মেয়েরা কিন্তু এই সব নিয়মের মধ্যে আজকাল আর পরেনা । যেমন , আমার মত মেয়েদের –

১।   ছেলে বন্ধু থাকতে নেই

২।   খোলা – মেলা পোশাক পরতে নেই

৩।   রাত ৮’টার পর বাড়ি ফিরতে নেই । আরও অনেক কিছু ……

এইসব নিয়ম না মানলেই , সমাজ যখন – তখন ‘ বাজে মেয়ে ‘ , ‘ নোংরা মেয়ে ‘ , বা ‘ নষ্ট মেয়ে ‘ র তকমা লাগিয়ে দিতে পারে । তাহলে তো আর রক্ষা নেই ……! তাই মা আমকে এইসব নিয়মগুলো পাখী পড়ানোর মত করে পড়াত । যদিও সবক্ষেত্রে আমি মোটেই এইসব নিয়ম মেনে চলতে পারিনি । coaching এ , বা university পড়ার সময় আমার বেশ কয়েকজন খুব ভালো ছেলে বন্ধু ছিল , আধুনিক পোশাকও পরেছি , কখনও কখনও প্রয়োজনে রাত ৮’টার পর বাড়িতেও ফিরেছি । ফলে , যথারীতি পাড়ার লোকেদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়েছে । এমনভাবে আমার দিকে তাকাত , যেন আমার বাবা নেই বলে আমি অন্য গ্রহের নাগরিকত্ব পেয়ে আবার বিনা passport এ পৃথিবীতে ফিরে এসেছি । আমি যেন সব সময়ই আলোচনার শীর্ষে । আর , একটা খুঁত বার করতে পারলে তো কথাই নেই , এক সপ্তাহের PNPC’র   ( পরনিন্দা – পরচর্চা ) খোরাক ।

আমি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর , মা আর একটুও সময় নষ্ট করেনি , নিজে উদ্যোগ নিয়ে আমার জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করে । বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জনা দশেক পাত্রের সন্ধান পাওয়া যায় । আমাকে ‘দেখে’ , সকলেরই আমাকে পছন্দ হয় ; কিন্তু কোন ক্ষেত্রে আমাদের পাত্র পছন্দ হয়নি , আবার কখনও পাত্র পক্ষের ‘ আমার বাবা না থাকা ‘ টা পছন্দ হয়নি । কালে কালে বিয়ে ব্যাপারটাতে আমারও কেমন যেন একটা অনিহা জন্মে গিয়েছিল । আসলে ইতিমধ্যেই জীবন থেকে এত বেশি অভজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছিলাম যে বিয়ের প্রতি অনিহা free ‘ তে এসে গিয়েছিলো । যেমন তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনলে , একটা কণ্টেনার একদম free ! free ! free ! ............। ভেবেছিলাম , বিয়ে টিয়ে করবো না ; আমার সরকারি চাকরি আছে , মা আছে , আর একটা নিজস্ব থাকার ব্যাবস্থা করে নেব , ব্যাস ! আমি আর মা থাকবো । - এই কথাটা মা’কে বললেই , মা বলতো – “ আমার তো তুই ছিলি , আমি না থাকলে তোর কে থাকবে বল ? তোকে কে দেখবে ? তোকে একা রেখে আমি তো মরেও শান্তি পাবোনা রে । “ – একেই বলে emotional অত্যাচার ।

           

তারপর ঠিক হয়েছিল , আমি খবরের কাগজ দেখে পাত্র খুঁজবো আর মা ফোন করে তাদের সঙ্গে   কথা বোলবে । বুঝে গিয়েছিলাম যে এভাবে মা’কে বোঝানো অসম্ভব , অন্য কোন প্ল্যান বার করতে হবে। হঠাত মাথায় একটা idea আসে……! খবরের কাগজ দেখে যদি এমন পাত্রদের খুজে বার করি, যাদের  আমাকে reject করার ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে………এইভাবে আর কিছু না হোক, কয়েক বছর সময় নষ্ট করা যাবে ।  ব্যাস ! তারপর মাকে বলবো,’’ সবাই আমাকে reject করছে , আমি প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করছি , আমি আর বিয়েই করবো না ।‘’ সেই প্ল্যান অনুযায়ী এগোচ্ছিলাম ,। খবরের কাগজ খুলে দেখি একটা বিজ্ঞাপন জ্বলজ্বল করছে ......মোটা মোটা অক্ষরে লেখা ঃ কলিকাতা নিবাসি , একমাত্র পুত্র, সকল পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক প্রাপ্ত , বহু পুরষ্কার প্রাপ্ত , গোল্ড মেডেলিস্ট , বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও রোবটিক্স সংক্রান্ত গবেষণারত পাত্রের জন্য সুন্দরী , উচ্চশিক্ষিতা , সাংস্কৃতিক মনস্ক , পশুপ্রেমি পাত্রী কাম্য। জাতি , ধর্ম নির্বিশেষে যোগাযোগ করুন ********** “  দেখেই বুঝেছিলাম , ইনি নিশ্চয় আমায় বিয়ে করবেন না , কোনও ইঞ্জিনিয়ার  বা ডাক্তার মেয়ে’কেই বিয়ে করবেন, কারণ ওর তুলনায় আমি নিতান্তই সাধারণ , অতি সাধারন ঃ কলা বিভাগে পড়াশোনা করেছি , M.A. , B.Ed . , ক্লাসে দু’তিন বার সাকুল্যে র‍্যাঙ্ক করেছি , গ্রাজুয়েশন ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ হয়েছিলাম , এছাড়া নাচ , আঁকা , সেলাই , রান্না , হাতের কাজ জানতাম আর একটা নিউজ চ্যানেলে খবর পরতাম , মানে ওটা একটু পারতাম ...।এই ...।ব্যাস...! । মা’কে জানালাম – এই পাত্রটিকে আমার পছন্দ হয়েছে , তুমি কথা বলো । মা ফোনে ওদের সঙ্গে কথা বলেছিল আর সেই মত আমার বায়োডাটা’ও পাঠানো হয়েছিল । আমি জানতাম কোনও উত্তর আসবে না , তাও প্রতিদিন মায়ের সামনে , সারাদিনে অন্তত একবার এমন একটা ভাব করতাম যেন উত্তর এর অপেক্ষায় আমি ব্যাকুল হয়ে আছি …। কিন্তু মনে মনে আমার যে কি আনন্দ হত …… কি বলবো …! তবে সেই আনন্দ বেশিদিন আমার কপালে সইল না , দিন – পনেরো পর ওরা উত্তর পাঠালেন , যে ওরা আমাকে দেখতে আসছেন । তখনও অবশ্য একটু আশা ছিল ……হয়তো বা আমাকে পছন্দ করবেন না ……। যথা সময়ে ওরা আসলেন , প্রথম দেখাতেই আমি ওদের পছন্দও হয়ে যাই । কিন্তু পাকা কথা দেওয়ার আগে , মা ওদেরকে আমাদের অন্ধকার অতীতের সমস্ত কথা জানিয়ে দিয়েছিল । সব শুনে পাত্র’টি বলেছিলেন – ‘’এই সব নিয়ে আমাদের কোনও সমস্যা নেই , এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা বটে কিন্তু এতে তো পাত্রীর কোনও দোষ নেই , বরং দেখতে গেলে ও’তো  নিজেই এই দুর্ভাগ্যের শিকার । “ সেদিন সত্যিই আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম , এই সমাজে আমাদের ব্যাপারে এই ভাবেও কেউ ভাবে , বিশেষ করে যখন সে নিজে বিয়ের পাত্র ……। নাহলে, সহানুভূতি দেখানোর জন্য তো মুখে অনেকেই অনেক কথা বলে…! তারপর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই , কেমন যেন একটা প্রবাহের মত – প্রথম দেখা , পাকা কথা , কুষ্ঠী বিচার , বিয়ের দিন ক্ষণ নির্ণয় – সব কিছু ঠিক ঠাক হয়ে গেলো। এপ্রসঙ্গে একটি কথা অনস্বীকার্য , পাত্রের বাবা-মা’ও কিন্তু কম মানসিক প্রসারতার পরিচয় দেননি । তবে আমি কিন্তু সেদিন মোটেই বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে যায়নি , বরং সব কিছু এমন ভাবে ঘটে গিয়েছিল যেন , স্বয়ং চাঁদই বামুনের কাছে নেমে এসেছিল ; এবার বামুন কোন যুক্তিতেই বা চাঁদকে প্রত্যাখান করতো………?

 

            অঘ্রাণের , একটি নির্দিষ্ট দিনে ,গোধূলি লগ্নে আমাদের বিয়ে হয় । বিয়ের সমস্ত নিয়ম আমি নিষ্ঠা ভরে পালন করেছিলাম , কেবল একটি নিয়ম ছাড়া । পরের দিন, শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবার সময় আমি কনকাঞ্জলি দিইনি ; ইচ্ছা করেই দিইনি , জেনে-বুঝেই দিইনি , মনে হয়েছে তাই দিইনি , কারণ আমি জানতাম যে ঐ দুমুঠো চাল কেন , নিজের জীবন দিয়েও , কোনোদিন , কোনোভাবেই আমি মায়ের ঋণের এক ভাগও শোধ করতে পারবোনা ।

           

            আমার কাছে , বিয়েতে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহারটি ছিল – শ্বশুর মশাইকে বাবা বলে ডাকতে পারা । সত্যি , শ্বশুর মশাই’কে বাবা বলে ডাকতে পেরে কি যে আনন্দ হত...! কিন্তু তাতে কি ? তাতে তো আমার নিজের বাবা না থাকার কলঙ্কটা কিছুমাত্রও হাল্কা হয়ে যায়নি । আর সেই জন্যই তো , যারা একদিন পরম ঔদার্য দেখিয়ে আমাকে বাড়ির বউ করে নিয়ে এসেছিলো ,আমি একটু পুরনো হতে না হতেই, পান থেকে চুন খসলে তারাই বলত – “ এইজন্য , এইসব পরিবারের মেয়েদের বাড়ির বউ করে আনতে নেই , এরা কারোও ভালো সহ্��� করতে পারেনা । “ কিন্তু আমার দোষটা কি ছিল ? আমার শ্বশুর – শ্বাশুরি দু’জনেই সুগার ও প্রেশারের রুগী ছিলেন , তাই ওদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছিলাম । আমার ননদ দিনের পর দিন কলেজে ক্লাস না করে বাড়িতে বসে থাকতো , তাই তাকে রোজ ক্লাস করার পরামর্শ দিয়েছিলাম । আর আমার স্বামীকে বলেছিলাম , ‘’ কথায় কথায় , কারণে – অকারণে এত ওষুধ খেয়ো না ।‘’ এইগুলোই আমার দোষ । হয়তো আমার জায়গায় কোনও বাবা-মা ওয়ালা মেয়ে হলে , এই দোষগুলোকেই , ওরা গুন বলে মেনে নিতেন ……!

 

            পৃথিবীতে বোধ হয় এমন সংসার খুব কম আছে যেখানে কোনও অশান্তি নেই । বেশির ভাগ সংসারেই অল্প-বিস্তর আশান্তি থেকেই থাকে । আমাদের সংসারেও ছিল । প্রথম দিকে মা’কে কিছুই জানাতাম না , মা কষ্ট পাবে বলে । কিন্তু মা তো মা’ই হয় – সব বুঝে যেতো । মা সব সময়ই আমাকে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শই দিতো । বলতো , “ ওরা যা চাইছে , তুমি তাই করো ।“ করার চেষ্টাও করেছি । তবে একদিন মায়ের সামনেই এমন কিছু ঘটে গিয়েছিলো যে মা আমার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে এক প্রকার বাধ্যই হয়েছিল । মা ওদের বলেছিল – “ ওর বয়সটা কম , অভিজ্ঞতাও কম তাই সবটা বুঝে উঠতে

পারছেনা বা ঠিক ঠাক সিধান্তও নিতে পারছেনা । আপনারা একটু মানিয়ে নিননা , ও’ও ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে । “ ব্যাস …! ওমনি আমার শ্বাশুরি বলেছিলেন  - “ আমরা কেন মানিয়ে নিতে যাবো ? আমার ছেলে ওকে উদ্ধার করেছে , এটাই অনেক বড় কথা ।“ আর আমার শ্বশুর মশাই বলেছিলেন – “ আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে তুমি নাক গলাতে এসোনা । তুমি নিজেও স্বামীর ঘর করতে পারোনি , আর তোমার মেয়েকেও করতে দেবেনা । মাঝখান থেকে আমার ছেলের জীবন’টা নষ্ট হয়ে যাবে ।“ সেদিন অতি কষ্টে মা নিজের চোখের জল আতকে রেখেছিল কিন্তু আমি পারিনি । এর আগেও বহূবার মা’কে স্বামীর ঘর করতে না পারার খোটা শুনতে হয়েছিল , তবে আমার শ্বশুর বাড়িতে , আমার সামনে দাড়িয়ে মা’কে এই কথাটা শুনতে হবে , সেটা আমি কোনোদিন ভাবতেও পারিনি ।         

              প্রতিদিন আমি একটু একটু করে বুঝেছি , আমার বাবা আমাদের সঙ্গে না থেকেও , সব সময়ই আমদের সঙ্গে থেকেছে । আসলে বাবার অনিপস্থিতি’টাই আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এমন ভাবে উপস্থিত থেকেছে যে বাবার না থাকার অস্থিত্বটাই টের পাইনি । আর সেই জন্যই বোধ হয় এটা আশা করার সাহসই হয়নি – বাবা কোনোদিন আমার হাত দুটো চেপে ধরে বোলবে “ তুই এগিয়ে যা মা , আমি তোর পাশে আছি “ । বা এই স্বপ্নটা দেখারও সৌভাগ্য হয়নি , বাবা কোনোদিন মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বোলবে “ তুমি চিন্তা কোরোনা , আমি তো আছি ।“ বরং বাবাকে মনে পরলে , বাবার কথা চিন্তা করে আমি আর মা দু’জনেই সবসময় এমন ভাবে চোখের জল ফেলেছি যাতে কেউ কারো চোখের জল দেখতে না পাই । তবুও আমি সারা জীবন সেই অপরাধের শাস্তি পেয়েছি , যে অপরাধটা আমি করিইনি । আর মা’ও তো তাই । কেন মা বাবার সাথে থাকতে পারেনি ? কেন মা সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে – এই সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর জেনেও লোকে বারবার মা’কেই দোষী ঠাওরেছে , কলঙ্কের ভাগী করেছে , উঠতে-বসতে কথা শুনিয়েছে । তার জীবনের struggle’টাকে ক’জনই বা বাহবা দিতে পেরেছে…? আর যার জন্য আমার আর মা’এর জীবনটা নরক হয়ে উঠেছে , সে কিন্তু বহাল তবিয়তেই আছে । শুনেছি আরেকটা বিয়ে করেছে । কিন্তু তাতে কি ? তাতে তার গায়ে কলঙ্কের ছিটে ফোটাও লাগেনি । বরং পুরুষত্বের মাপকাঠিতে সে একধাপ এগিয়েই গিয়েছে।

                                               

                                                **************************************

 

              আজকাল , রথের মেলায় , স্কুলের সামনে বা কোনও পার্কের পাশের দোকানে বাচ্ছাদের নানা রকমের মুখোশ – টুখোশ বিক্রি হতে তো খুব একটা দেখিনা ; অবশ্য এখন তো সবার কাছেই নিজস্ব মুখোশ আছে , প্রয়োজন অনুযায়ী যে মুখোশগুলো বদলেও ফেলা যায় । সেই জন্যই তো দেখি , যেখানে কন্যাশ্রী প্রকল্প , ভাগ্যশ্রী যোজনা নিয়ে লোকে প্রবল মাতামাতি করে , সেখানেই আবার  আমার মত  আরও অনেক ‘’বাপে খ্যাদানো ‘’ মেয়েদের জীবনে বার বার, বাবার না থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে । আর আমার মায়ের মত স্বামী – পরিত্যক্তা স্ত্রীদের জীবনে , স্বামীর না থকাটাই সবথেকে বড় থকা হয়ে যায় । আর এই সমাজে থেকেও , মায়ের সাথে আমিও আজীবন থেকে যাই নির্বাসিত ।

                                    ****************************************************

 

           

 

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day