বয়স হওয়া মানে...
1621
4
2
|   Jul 26, 2017
বয়স হওয়া মানে...

গাড়ি চালাতে শুরু করে রিমঝিম মনে করতে পারছিলো না  কিছুক্ষন এর জন্য কোথায় যাচ্ছে , পেছনে বসা মিম কে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যেন যাচ্ছি আমরা , "Swimming Class Mamma " ওহ হাঁ তাই তো , আজ কাল কি যে হয়েছে রিমঝিম এর , বোধহয় বয়স বাড়ছে , কথায় কথায় ভুলে যায় সব.. রান্না ঘর থেকে ধরো শোবার ঘর এ গেলো, মনেই করতে পারে  না  কিসের জন্য এসেছিলো আবার ফিরে যেতে হয় রান্না ঘর এ , মনে করার জন্য.

 কি অদ্ভত, রিমঝিম এর ঠাম্মির ও ঠিক এইরকম হতো. মনে রাখতে পারতো না. " কি যেন একটা বলবো ভেবে ছিলাম, ওই দেখ আবার ভুলে গেলাম". 

ঠাকুর ঘর এ  বসে পান সাজতো রিমঝিম এর ঠাম্মি , আর বলতো রিমঝিম কে, "বয়স হলে এমন হয় বুঝলি পিপলী" ? "কি হয় গো"? "এরকম হাতের চামড়া টা নরম হয়ে যায়" , আসলে রিমঝিম এর খুব ভালো লাগতো ঠাম্মির হাত গুলো তে হাত বোলাতে , কি সুন্দর নরম তুলতুলে চামড়া , তুলোর মতো. রিমঝিম এর ছোটবেলা টা জুড়ে ঠাম্মি . সব সময় পায়ে পায়ে ঘুরতো. পান সেজে দিতো , ফুল তুলে দিতো, , ঠাকুরের  বাসন মেজে দিতো,ঠাকুর ঘর মুছে দিতো, ফুল এর গাছ এ জল দিতো. সব যেন ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে.

ঠাম্মি বলতো কবে আমার পিপলী বড়ো হবে আর হাতে ঘড়ি পড়ে অফিস যাবে. পিপলী অবশ্য তখন ঠিক বুঝতো না হাতে ঘড়ি পড়ার সাথে বড়ো হবার কি সম্পর্ক , কিন্তু আজ যখন সত্যি সত্যি ঠাম্মির সেই পিপলী আজকের রিমঝিম মিত্র অফিস যায়, বিশেষ করে খুব গুরুত্ব পূর্ণ কোনো দিন, খুব মনে পড়ে ঠাম্মির কথা, মনে হয় একবার যদি ঠাম্মি কে দেখাতে পারতো, বলতে পারতো, একটা snap chat ছবি যদি share করতে পারতো , ঘড়ি পড়ে office যাবার একটা ছবি নিশ্চই share করতো.

ঠাম্মি TV দেখতে ভালোবাসতো , তখন সবে টিভি এসেছে ঘরে. রিমঝিম এর মনে আছে ছাদ এর ওপর এন্টেনা থাকতো, আর সেই এন্টেনা মাঝে মাঝে  ঘুরে যেত, আর ব্যাস , ছবি পরিষ্কার আসতো না, তখন রিমঝিম এর সোনাকাকাই এর ওপর দায়িত্ব পড়তো সেই  এন্টেনা সোজা করার. রিমঝিম একটা মাঝামাঝি position এ দাড়াতো , সোনাকাকাই একটু একটু করে এন্টেনা সোজা করতো , আর রিমঝিম নীচে TV র ছবি পরিষ্কার  হলো কিনা সেই খবর টা পৌঁছে দিতো . "আরেকটু আরেকটু ডান দিকে, না না, যা আবার  ঝাপসা হয়ে গেলো " . টিভি তখন বেশ বিলাসীতা ছিল. পাড়ার এক বাড়ি তে রঙ্গীন TV ছিল. রবিবার করে সেখানে পাড়ার সব বন্ধুরা মিলে রঙ্গোলি দেখতে ভীড় জমাতো.

রিমঝিম ছিল বাড়ির প্রথম নাতনি , তাই ঠাম্মির শুধু কেন বাড়ির সবার চোখের তারা ছিল সে . যেমন কোনো দিন যদি স্কুল এর রিক্সা কাকু না আসতো, তাহলে সোনাকাকাই সাইকেল করে পৌঁছে দিয়ে আসতো স্কুল এ.

স্কুল সে কিছুতেই কামাই করবে না. বৃষ্টি বাদল মাথায় নিয়ে, ভিজে একশা হয়ে ও স্কুল যাওয়া চাই ই চাই তার. স্কুল ছিল তার প্রাণ. না এমন টা ভাবার কোনো কারণ নেই যে পড়াশোনা করার জন্য সে স্কুল যেতে চাইতো সব সময় , কি যেন একটা আকর্ষণ ছিল সেই হলুদ বাড়ি টাতে , পুরো তেরো বছর কাটিয়াছে সে সেখানে. কত যে স্মৃতি থেকে  গেছে সেখানে.

আজকাল social media র দৌলতে স্কুল এর অনেক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকেই ফিরে পাওয়া গেছে, তাও অনেক কেই পাওয়া যায়নি. রিমঝিম এর মাঝে মাঝে তাদের কথা মনে পড়ে হঠাৎ করেই কিছু  করতে গিয়ে, যেমন সেদিন একটা আলুর তরকারি করছিলো , হঠাৎ ই মনে হলো স্কুল এ শাস্বতী বলে একটি মেয়ে ছিল , সে অবিকল ওরকম একটা আলুর তরকারি আর রুটি টিফিন আনতো রোজ . এই ব্যাপারে কিন্তু একটা কথা না বলেই নয়, রিমঝিম এর মা রিমঝিম কে রোজ নতুন নতুন টিফিন করে দিতেন. আজ ঝখন রিমঝিম এর ওপর সেই এক দায়িত্ব তখন রোজ সকালে বড্ডো মনে পড়ে , সেই হলুদ রং এর টিফিন বাক্স টার কথা , কি জানি ম��� কিভাবে রোজ এতো রকম করে দিতো .

রিমঝিমদের  বাড়ি তে অনেকে ছিল. , যৌথ পরিবার, যা আজকাল বোধহয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু বাংলা serial এই দেখা যায়. সেই সব দিন গুলো আক্ষরিক অর্থে ছিল সোনার দিন . রিমঝিম এর বেশ মনে আছে ওদের সেই বাড়ি তে একটা ঘর ছিল সেই ঘরের ওপরে একটা ঘর থাকার সুবাদে সেই ঘর টা গরম  কালের দুপুর বেলা অপেক্ষাকৃতভাবে ঠান্ডা থাকতো , তাই সবার প্রিয় ছিল. দুপুর বেলা খেয়ে উঠে সেই ঘরে শোবার জন্য হুড়োমুড়ি পরে যেত. আজ মাঝে মাঝে শূন্যতা যেন গ্রাস করে রিমঝিম কে. মনে হয় সবাই কে নিয়ে যদি  থাকতে পারতো !! আরেকবার যদি ওরকম একটা ঘেঁষাঘেষি করে শোয়া দুপুর বেলা ফিরে পেত !!

গরম কালের আরেকটা কথা খুব মনে পরে মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া ; পুরো এক মাস এর ছুটি তে যেত. যাওয়ার সময় যত আনন্দ ফেরার সময় ঠিক তত টাই কান্না পেত . বেশ মনে আছে মামাবাড়ির উল্টোদিকে একটা লন্ড্রির দোকান ছিল , রিমঝিম এর মনে হতো ইশ ওদের কি ভাগ্য সারা বছর মামাবাড়ির সামনে থাকতে পারে , ছেড়ে যেতে হয় না . এখন ভাবলে হাসি পায়, লন্ড্রির দোকান এর  যে ওটা মামাবাড়ি ছিল না এটা তখন মনেই  থাকতো না.

বাড়িতে শীতকালে , বারান্দায় বসে কমলালেবু খাওয়া হতো সবাই মিলে. বারান্দা টা খুব প্রিয় ছিল রিমঝিম এর. সে অনেক বার শুনেছে বড়োদের আলোচনা করতে ওরকম খোলা বারান্দা রাখা ভালো নয়, Grill  লাগানো উচিত. শুনেই মন টা খারাপ হয়ে যেত রিমঝিম এর.

শুধু বারান্দা নয়, বারান্দা আর ছাদ এই দুটো জায়গা রিমঝিম এর সবচেযে প্রিয় ছিল. ছাদ এ বসে গল্পের বই পড়তো সে. তার ছোট বেলার সব বই সোনাকাকাই এর কিনে দেওয়া ছিল, প্রতিবার জন্মদিন এ বই পেতো সে .

আজ একথাগুলো ভাবতে বসে বড্ডো অবাক লাগছে রিমঝিম এর , তার ছোট বেলায় যখন বাবা সব কথায়  "জানিস আমাদের ছোট বেলাতে তো এরকম ছিল...." বলে শুরু করতো , আর আড়ালে রিমঝিমরা সব বোন রা হাসাহাসি করতো , এই রে আবার সেই একই শুরু হবে….

আর আজ রিমঝিম এর গাড়ি চালাতে বসে মনে পড়ে না কোথায় যেন যাচ্ছে, কিন্তু সেই ছোট বেলার কথা মনে পড়ে, কথায় কথায় মিম কে গল্প করে কত কিছু.. নিজের মধ্যে কোথায় যেন খুঁজে পায় ঠাম্মি কে, মা কে বাবা কে সবাই কে .

যখন মিম sleep over  করতে চায়, রিমঝিম নিজের মধ্যে দেখতে পায় নিজের সেই ৩০ বছর আগের মাকে, ছোটবেলার গল্প বলার মজাতে দেখতে পায় বাবাকে, ভুলে যাবার মধ্যে খুঁজে পায় ঠাম্মিকে...

এ যেন আবহমান , আদি অনন্ত কাল ধরে চলে আসা এক গল্প... এ বোধহয় চলছে, চলবে.

Related Link: https://www.mycity4kids.com/parenting/unplug-and-unwind/article/recipe-and-reminiscence

 

 

Read More

This article was posted in the below categories. Follow them to read similar posts.
LEAVE A COMMENT
Enter Your Email Address to Receive our Most Popular Blog of the Day